রাজধানীর মতিঝিল ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে চিকিৎসকদের অবহেলা ও ভুল চিকিৎসায় ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরীর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। এই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আহত হয়েছেন ২ জন সংবাদকর্মী, ভাঙচুর করা হয়েছে তাদের ক্যামেরা।
গত রবিবার (৪ অক্টোবর, ২০২৬) রাত ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এতে পেশাগত দায়িত্বে উপস্থিত সাংবাদিক মনির ও রাসেল সরকার আহত হন।
স্বজন ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার (২ অক্টোবর) সন্ধ্যায় তীব্র পেটব্যথা নিয়ে ১৩ বছর বয়সী কিশোরী মাহিমাকে মতিঝিল ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। জরুরি বিভাগের চিকিৎসকদের পরামর্শে আলট্রাসনোগ্রাফি করা হলে তার অ্যাপেনডিক্স ফেটে যাওয়ার বিষয়টি ধরা পড়ে।
স্বজনদের অভিযোগ, দ্রুত অস্ত্রোপচারের কথা বলা হলেও সারারাত কোনো অপারেশন করা হয়নি। পরবর্তীতে শনিবার সকালে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়ার আগেই মাহিমার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তড়িঘড়ি করে মরদেহ পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দেয়। স্বজনেরা লাশ নিয়ে নিজ গ্রাম গাজীপুরে চলে যান এবং রাতেই দাফন সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে পরিস্থিতি ভিন্ন খাতে নিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মৃত মাহিমার পরিবারকে ডেকে ১০ লাখ টাকা ও পরিবার থেকে একজনকে চাকরির প্রস্তাব দিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। তবে ভুক্তভোগী পরিবার সেই প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে সংবাদকর্মীরা হাসপাতালে গেলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সাংবাদিকরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ভুল চিকিৎসার দায় এবং চাকরি দেওয়ার প্রস্তাবের কারণ জানতে চাইলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।
সন্ধ্যার দিকে বিচার চাইতে আসা ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় লোকজনের ওপর হাসপাতালের পক্ষ থেকে হামলা চালানো হয়। এ সময় পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সংবাদকর্মীদের ওপর চড়াও হয়ে তাদের ক্যামেরা ভাঙচুর এবং সরাসরি হামলা চালানো হয়। এতে সাংবাদিক মনির হোসেন ও মো. রাসেল সরকারসহ দুইজন আহত হন। পরবর্তীতে আহত দুই সাংবাদিক শাহজাহানপুর থানায় উপস্থিত হয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
নিহত মাহিমার চাচাতো ভাই শাহরিয়ার সবুজ বলেন, "শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় ভর্তি করার পর চিকিৎসকরা অপারেশনের প্রস্তুতি নিলেও রাতে তা করেননি, যার ফলে আমার বোন মারা গেছে। আমরা এর সুষ্ঠু বিচার চাইতে গেলে হাসপাতালের লোকজন আমাদের ওপর হামলা চালায়। টাকা বা চাকরির কোনো অফার আমরা চাইনি, তারা নিজেরাই বিষয়টি ধামাচাপা দিতে চেয়েছিল। আমরা কোটি টাকা দিলেও এই আপস মানব না।" অন্যদিকে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীল প্রতিনিধি ভুল চিকিৎসার অভিযোগ এড়িয়ে গিয়ে দাবি করেন যে, রোগীর স্বজন ও স্থানীয়রা মিলে হাসপাতালে ভাঙচুর চালিয়েছে এবং তাদের ১০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী আহত হয়েছেন।
শাহজাহানপুর থানার ওসি মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম জানান, "একজন ১৩ বছরের কিশোরী রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রোগীর স্বজন ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এ সময় সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে জেনেছি।
খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে। থানায় উপস্থিত হয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন দুই সাংবাদিক, আমরা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করব।" ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। নিহতের পরিবার ও সাংবাদিক সমাজ এই ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার দাবি করেছেন।
মতামত