কূটনৈতিক একঘরে দশা, অর্থনৈতিক অবরোধ আর সামরিক আক্রমণের ধাক্কা সামলে অবশেষে ইরান তার সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন—ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের মুখোমুখি হয়েছিল। তবে সবাইকে অবাক করে দিয়ে শেষ পর্যন্ত তারা সেই যুদ্ধে টিকে গেছে। ফলে আপাতদৃষ্টিতে এখন তেহরানের দিনগুলো বেশ ভালোই যাচ্ছে বলা যায়।
ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস এবং সরকার পতনের লক্ষ্য নিয়ে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপক বোমাবর্ষণ করলেও তা মারাত্মকভাবে ব্যর্থ হয়। উল্টো, যুদ্ধ শুরুর আগের চেয়ে তেহরান এখন আরও শক্তিশালী। তারা হরমুজ প্রণালি দখল করে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম এখন আকাশচুম্বী।
প্রচণ্ড বোমাবর্ষণের মধ্যেও ইরানের সশস্ত্র বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা দেখিয়েছে। অন্যদিকে, যুদ্ধের প্রতি মার্কিন জনগণের সমর্থন কমছে এবং ওয়াশিংটনের ওপর আন্তর্জাতিক ক্ষোভ বাড়ছে। তাই বিশ্লেষকদের মতে, তেহরান আগামী বছরজুড়ে এই একই কৌশল ধরে রাখবে।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে টিকে থাকায় ইরানি কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে সাফল্য ও বিজয়ের বড়াই করলেও ভেতরে ভেতরে তাঁরা উদ্বিগ্ন। কারণ তাঁরা জানেন, ইরানের ওপর চাপ আরও বাড়ানোর মতো অনেক পথ ও অস্ত্র এখনো যুক্তরাষ্ট্রের হাতে রয়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ভাবতে পারে যে ইরানের ভয়কে কাজে লাগিয়ে চাপ দিয়ে তাদের নতি স্বীকার করানো যাবে। কিন্তু এতে তেহরানের আসল মনোভাব ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়।
যুদ্ধে স্বজন ও সহকর্মীদের হারিয়ে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব এখন আরও কঠোর। শত্রুকে চিরতরে পরাস্ত করাই এখন তাঁদের প্রধান লক্ষ্য।
তাই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরান এখন প্রতিনিয়ত সংঘাত বাড়ানো এবং আক্রমণাত্মক থাকার কৌশল নিয়েছে। তেহরান কোনো সমঝোতায় তো যাবেই না, বরং যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্রদের অর্থনীতি ধ্বংস ও জ্বালানি বাজার অস্থিতিশীল করতে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেবে।
সেই সঙ্গে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলা বাড়ানো, মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের গুপ্তহত্যার চেষ্টা চালানো, এমনকি প্রতিবেশীদের ওপর পদাতিক হামলা চালিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর মার্কিন ঘাঁটি দখলের চেষ্টাও তাদের কৌশলে রয়েছে।
দুটি পক্ষই যদি সাময়িক চুক্তিতে পৌঁছায়, তবু সেই শান্তি দীর্ঘস্থায়ী হবে না। কারণ তেহরানের বিশ্বাস, ওয়াশিংটন সময় নিয়ে শক্তি গুছিয়ে আবার আক্রমণ করবে। তাই মার্কিন উসকানির জবাব দিতে বা উসকানি ছাড়াই হামলা চালাতে তারা প্রস্তুত।
সহজ কথায়, তেহরানের মূল লক্ষ্য হলো মধ্যপ্রাচ্যে টিকে থাকাকে ওয়াশিংটনের জন্য এতটাই যন্ত্রণাদায়ক করা, যাতে তারা সৈন্য প্রত্যাহার করতে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ মেনে নিতে এবং তেহরানকে আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।
হামলা শুরুর সময় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সর্বোচ্চ নেতা খামেনির বাসভবনে বৈঠকে ছিলেন। আরাগচি যখন পরিস্থিতি এবং যুদ্ধের আশঙ্কার কথা জানিয়ে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ব্রিফ করছিলেন, ঠিক তখনই ওপর থেকে বোমাবর্ষণ শুরু হয়।
প্রথম দফাতেই খামেনির বাসভবনে হামলায় সর্বোচ্চ নেতাসহ বহু শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন। তবে আরাগচি অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। ধূলিমলিন অবস্থায় ধ্বংসস্তূপ থেকে বেরিয়ে তিনি একটি চলন্ত গাড়িতে উঠে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পৌঁছান। সেখানে গিয়েই তিনি সামরিক কমান্ডার ও বিদেশি নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন এবং বেঁচে থাকা অন্য কর্মকর্তারাও দ্রুত তাঁর সঙ্গে যোগ দেন।
শীর্ষ নেতৃত্ব নিহত হতে পারে—এমন পরিস্থিতির প্রস্তুতি তেহরানের আগেই ছিল। সরকার আগের বছর থেকেই প্রশাসনিক ও সামরিক বিকেন্দ্রীকরণ করে রেখেছিল, যাতে কেন্দ্র ছাড়াই গভর্নর ও কমান্ডাররা কাজ চালাতে পারেন। এ ছাড়া প্রতিটি জ্যেষ্ঠ পদের জন্য অন্তত দুজন করে উত্তরসূরি ঠিক করা ছিল, যাতে কোনো নেতৃত্বশূন্যতা তৈরি না হয়।
বিদ্যুৎ ও পরিবহনের মতো বেসামরিক অবকাঠামোয় মার্কিন হামলা ইরানি অভিজাতদের ক্ষিপ্ত করে তোলে, যা তাদের শত্রুভাবাপন্নতা আরও বাড়িয়ে দেয়। তারা নিশ্চিত হয় যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কেবল তাদের সরকার ধ্বংস করতে চায় না, বরং পুরো ইরান রাষ্ট্রটিকেই নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায়।
ফলে তেহরান অত্যন্ত আক্রমণাত্মক রূপ নেয়। মোজতবা খামেনি নিহত ব্যক্তিদের স্থলে কঠোরপন্থী সামরিক কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দিয়ে আক্রমণাত্মক অভিযানের নির্দেশ দেন। সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের নতুন সচিব মহসেন রেজাই ঘোষণা করেন, মার্কিন ঘাঁটির পাশাপাশি তারা এবার মার্কিন অর্থনৈতিক সম্পদ ও তেল কোম্পানিতেও আঘাত হানবেন।
শাসনগোষ্ঠীর এই নতুন কৌশলের উদ্দেশ্য কেবল মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ গড়া নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা অবকাঠামোকে দুর্বল করে দেওয়া। এ জন্য ইরানের কৌশল হচ্ছে, বড় সংঘাতের মধ্যবর্তী সময়ে সীমিত হামলার মাধ্যমে শত্রুর শক্তি কমানো হয়। তেহরানের আশা, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র একসময় নিজেদের ও মিত্রদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়ে অঞ্চল ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হবে।
ইরানের নেতারা নিজেদের কৌশলের ফলাফলে বেশ সন্তুষ্ট। তাঁদের বিশ্বাস, অঞ্চলজুড়ে সংঘাত ব্যাপক বাড়িয়ে দেওয়ার কারণেই ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা সীমিত করেছে এবং সংঘাতের তীব্রতা কিছুটা কমাতে বাধ্য হয়েছে।
তবে ইরানি অভিজাতরা নিজেদের চূড়ান্ত বিজয়ী মনে করেন না। দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তারা ইসলামিক রিপাবলিকের পতন আসন্ন বলে দাবি করে আসছেন। সামরিক শক্তিমত্তা দেখানোর পরও তাঁরা ইরানকে দুর্বল হিসেবেই তুলে ধরছেন।
তেহরানের দৃষ্টিতে বাস্তবতার সঙ্গে শত্রুদের এই ভুল ধারণার ফারাক অত্যন্ত বিপজ্জনক। ইরানি কর্মকর্তাদের বিশ্বাস, ওয়াশিংটন যদি মনে করে আরেকটি নিষেধাজ্ঞা, সামরিক হামলা বা অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভেই তাদের পতন হবে, তবে তারা চাপ দেওয়া থামাবে না।
অতীতে কিছু ইরানি নেতা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের আশা করলেও, এখন শাসকগোষ্ঠীর কেউই তা আর বিশ্বাস করে না। তারা নিশ্চিত যে ওয়াশিংটন কখনোই সততার সঙ্গে চুক্তি মানবে না।
এর প্রমাণ হিসেবে তারা ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা বেরিয়ে যাওয়াকে দেখে। এমনকি ২০২৫ সালের জুন ও ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি—দুইবারই আলোচনার টেবিলে বসা অবস্থাতেই মার্কিন হামলার শিকার হয় ইরান।
ইরানি শাসকগোষ্ঠী এটাও আশঙ্কা করছে যে তাদের এই সুবিধাজনক অবস্থান চিরস্থায়ী হবে না। পর্যাপ্ত সময় পেলে বিশ্ব অর্থনীতি পারস্য উপসাগরের বিকল্প রুট খুঁজে নিতে পারে, ফলে হরমুজ প্রণালি বন্ধের যে অর্থনৈতিক সুযোগ ইরানের হাতে আছে, তা কার্যকারিতা হারাবে।
অন্যদিকে, ওয়াশিংটনের অবস্থান দিন দিন আরও শক্তিশালী হতে পারে। ইরানি নেতাদের মতে, সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় রিপাবলিকানদের জয়ের স্বার্থে এবং যুদ্ধ মার্কিন জনমতে অপ্রিয় হওয়ায় ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন সংযত আছেন। তবে নির্বাচন পার হয়ে গেলে তাঁকে আর জনমত নিয়ে ভাবতে হবে না।
তেহরান ২০২৮ সালে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের আশা করলেও তাতে লাভ দেখছে না। একজন নরমপন্থী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইরানের জন্য আরও বেশি বিপজ্জনক হতে পারেন; কারণ তিনি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নত করে বিশ্বজুড়ে ইরানের বিরুদ্ধে ঐক্য গড়ে তুলতে বেশি সক্ষম হবেন।
তাই ইরানি শাসনগোষ্ঠী হাত গুটিয়ে বসে না থেকে এখনই ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বাড়াতে শুরু করবে।
প্রথমত, সরকার পারস্য উপসাগর থেকে গ্যাস ও তেল রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধের পদক্ষেপ নিতে পারে। তেহরান ইতিমধ্যে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে বাণিজ্যের একটি বড় অংশ অচল করলেও কিছু উপসাগরীয় দেশ এখনো ভারত মহাসাগর বা লোহিত সাগর দিয়ে পণ্য পাঠাতে পারছে।
এই রুটগুলো পুরোপুরি অচল করতে ইরান তাদের তেল উৎপাদন কেন্দ্র ও সমুদ্রবন্দরে সরাসরি হামলা চালাতে পারে। পাশাপাশি, তারা ইয়েমেনের হুতি মিত্রদের সঙ্গে মিলে লোহিত সাগরে জাহাজে আক্রমণের হুমকি দিয়ে সেই পথও বন্ধ করে দিতে পারে।
দ্বিতীয়ত, ইরান তার প্রত্যক্ষ শত্রুদের ওপর আক্রমণ আরও তীব্র করতে পারে। এর অর্থ হতে পারে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে আরও বেশি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো কিংবা মার্কিন বেসামরিক অবকাঠামোয় সাইবার হামলা করা।
পুনরায় আক্রমণ হলে, ইরান পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের সুপেয় পানি শোধনকেন্দ্রগুলোর মতো বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি দিতে পারে, যা পুরো অঞ্চলকেই বসবাসের অযোগ্য করে তুলবে।
সর্বশেষ, তেহরান মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের গুপ্তহত্যার পুরোনো কৌশলে ফিরে যেতে পারে। ১৯৮০-এর দশকে ইসলামিক রিপাবলিক ও তাদের লেবানিজ শিয়া মিত্ররা ইউরোপে ভিন্নমতাবলম্বীদের হত্যা এবং বোমা হামলায় শত শত মার্কিন ও ফরাসি সেনাকে হত্যার মতো ঘটনা ঘটিয়েছিল।
অবশ্য, শীর্ষ মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের হত্যা করা ইরানের জন্য সহজ হবে না। কারণ, ইসরায়েল বা ওয়াশিংটনের মতো ইরানের সামরিক বাহিনীর কাছে এফ-৩৫ স্টিলথ যুদ্ধবিমান বা অত উন্নত গোয়েন্দা ব্যবস্থা নেই। তবে তেহরানের হাতে অন্যান্য বিকল্প পথ খোলা আছে।
তারা ছদ্মবেশে গুপ্ত অভিযান চালিয়ে বা আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে পারে। শীর্ষ নেতা না পেলেও তারা তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কর্মীদের নিশানা করতে পারে।
ইরান হয়তো মনে করতে পারে যে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো একই পথ অবলম্বন করে তারা শত্রুকে নিরস্ত করতে পারবে। তবে এতে কাজ না হলে নতুন কৌশল ব্যবহারে ইরানি কর্মকর্তারা পিছপা হবেন না। উদাহরণস্বরূপ, তারা বৈশ্বিক যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার পথ বেছে নিতে পারে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহনের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ পরিকাঠামো—বিশেষ করে ইউরোপের সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়াকে যুক্ত করা সমুদ্র তলদেশের ইন্টারনেট কেব্লগুলো বিস্তৃত। ইরানি নৌবাহিনী এই কেব্লগুলো কেটে দিতে পারে।
আরও বড় পদক্ষেপ হিসেবে ইরান পার্শ্ববর্তী ভূখণ্ড দখলের চেষ্টা করতে পারে। ৭ অক্টোবরের পর ইসরায়েল নিরাপত্তার অজুহাতে গাজা, লেবানন ও সিরিয়ায় জমি দখল করায়, ইরানি বিশ্লেষকদের মতে ইরানেরও নিজস্ব ‘নিরাপত্তাবলয়’ গড়ে তোলা উচিত।
আমেরিকা স্থল হামলার প্রস্তুতি নিলে ইরান আগেই পদক্ষেপ নিতে পারে। মার্কিন কর্মকর্তারা ইরানের মূল তেল রপ্তানি কেন্দ্র খারগ দ্বীপ দখলের ইঙ্গিত দেওয়ার পর, দেশটির কিছু বিশ্লেষক ও কট্টরপন্থী সংসদ সদস্য কুয়েত ও বাহরাইনের মার্কিন ঘাঁটি দখলের প্রস্তাব দেন। তেহরান এসব পদক্ষেপকে আগ্রাসন নয়, বরং আত্মরক্ষার অংশ হিসেবেই উপস্থাপন করতে পারে।
উত্তরাঞ্চলেও তেহরান একই যুক্তি প্রয়োগ করতে পারে। আজারবাইজান ও ইরানের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই টানাপোড়েনের। কিছু আজারবাইজানি মনে করে ইরানের আজেরি-সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলো ‘বৃহত্তর আজারবাইজানের’ অংশ; আর অনেক ইরানি মনে করে বর্তমান আজারবাইজান প্রজাতন্ত্র হলো ‘বৃহত্তর ইরানের’ অংশ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটেছে।
আজারবাইজান ও ইসরায়েলের মধ্যে ঘনিষ্ঠ মিত্রতা রয়েছে। শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তাদের অভিযোগ, আজারবাইজান তাদের ভূখণ্ডকে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি অভিযানের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে দিচ্ছে। তেহরান আজারবাইজানের বিচ্ছিন্ন ছিটমহল ‘নাখচিভান’ দখল করার উসকানি পেতে পারে; আর তা না করলেও অন্তত সেখানকার জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর আক্রমণ চালাতে পারে।
একইভাবে, বিরোধীদের ঘাঁটি মনে করায় ইরান ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলে অনুপ্রবেশ করতে পারে। যুদ্ধের শুরুতে মার্কিন কর্মকর্তারা কুর্দি গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র দিয়ে স্থল হামলার কথা ভেবেছিলেন। ফলে তেহরান যদি মনে করে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েল থেকে ইরান পর্যন্ত কুর্দিস্তানের ওপর দিয়ে স্থলপথ তৈরি করতে চায়, তবে তারা আগেই সেখানে হামলা চালাতে পারে।
সবশেষে, তেহরান সেই চূড়ান্ত পদক্ষেপটি নিতে পারে, যা আমেরিকা ও ইসরায়েলি কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে আশঙ্কা করছেন এবং ঠেকানোর চেষ্টা করছেন: পারমাণবিক বোমা তৈরি। নেতারা যদি মনে করেন মার্কিন হামলা ঠেকানোর এটিই একমাত্র পথ, তবে এই ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তটিকেই তারা সবচেয়ে দায়িত্বশীল পদক্ষেপ হিসেবে বেছে নিতে পারেন।
ইরান পারমাণবিক বোমার দিকে না গেলেও, তাদের উসকানির জবাবে ইসরায়েল ও আমেরিকা আরও ভয়াবহ হামলা চালাতে পারে। তবে এক বিশাল ও ব্যয়বহুল পূর্ণাঙ্গ পদাতিক আক্রমণ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল অতিরিক্ত আর কী অর্জন করতে পারবে, তা অস্পষ্ট।
ইরানি শাসনগোষ্ঠী প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে সিদ্ধহস্ত, এবং তারা এটিকে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবেই দেখছে। তেহরান নিশ্চয়ই তাদের সব কৌশল বা অস্ত্র একবারে ব্যবহার করবে না।ওয়াশিংটন এই বাস্তবতা অনুধাবন করলে, ইরানের নতুন উসকানির জবাবে সাময়িক যুদ্ধবিরতি বা সংঘাত স্থগিত করার চেষ্টা করতে পারে।
তবে দীর্ঘ মেয়াদে এই কৌশল কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কম। ইসলামিক রিপাবলিক তাদের দাবিতে স্পষ্ট—তারা মধ্যপ্রাচ্য থেকে সব মার্কিন সৈন্যের প্রত্যাহার চায় এবং এই লক্ষ্য অর্জনে তারা অনির্দিষ্টকাল লড়াই চালিয়ে যেতে প্রস্তুত।
অবশ্য এমন বড় আক্রমণ চালানো বা সংঘাত বাড়ানো ইরানের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ইরান বেশি দূর এগোলে উল্টো সেই মার্কিন পদক্ষেপকেই ডেকে আনবে, যা তারা এড়াতে চায়—যেমন মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল মার্কিন সেনার আগমন ও পূর্ণাঙ্গ পদাতিক আক্রমণ।
ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতারা এই ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন। তাই তাঁরা বারবার জোর দিয়ে বলছেন, যেকোনো সামরিক সিদ্ধান্তের পেছনে অন্তত কিছু অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক সমর্থন থাকতে হবে।
তবে ইসলামিক রিপাবলিকের নেতৃত্বের বিশ্বাস, ট্রাম্প প্রশাসনের কথাবার্তা ও পদক্ষেপই ইরানের জনগণকে সরকারের পেছনে ঐক্যবদ্ধ করেছে। তাদের দাবি, অনেক বিদেশি সরকার গোপনে ইরানি কর্মকর্তাদের জানিয়েছে যে মার্কিন ও ইসরায়েলি চাপের মুখে ইরানের এই প্রতিরোধকে তারা শ্রদ্ধা করে।
এক অর্থে, ইরান এই পরিস্থিতির মুখোমুখি আগেও হয়েছে। ইসলামিক রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার পরপরই দেশটি ইরাকের আক্রমণ ও সশস্ত্র বিরোধী দলের মুখে পড়েছিল। ১৯৮১ সালে বোমা হামলায় শাসকদলের প্রায় পুরো নেতৃত্ব নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলে, বেঁচে যাওয়া নেতারা সিদ্ধান্ত নেন যে টিকে থাকতে হলে সংগঠনকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি শত্রুর ওপর এমন ভয়াবহ প্রতিশোধ নিতে হবে, যাতে তারা আর কখনো চ্যালেঞ্জ করার সাহস না পায়।
মোজতবা খামেনি ছাড়া ইরানের বর্তমান নতুন নেতাদের প্রায় সবাই সেই বিপ্লবকালীন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে উঠে এসেছেন। তাঁরা এই শিক্ষাটি খুব ভালোভাবেই মনে রেখেছেন। মার্কিন ও ইসরায়েলি আক্রমণ থামাতে হলে শক্তি জাহির করতে যা করা দরকার তা-ই করতে হবে।
সংঘাত বাড়ানো নিঃসন্দেহে এক চরম ঝুঁকিপূর্ণ খেলা। ইরান অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করলে তা বিপুল মার্কিন বাহিনীকে এই অঞ্চলে টেনে আনবে, আর যুদ্ধক্লান্ত সাধারণ মানুষও ক্ষুব্ধ হয়ে রাজপথে নেমে আসতে পারে।
তবে ইরানের বর্তমান নেতৃত্বের দৃঢ় বিশ্বাস, তারা অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ সামলে নিতে পারবে, আর এই আত্মবিশ্বাস থেকেই তারা দ্রুত পদক্ষেপ নিতে চাইছে। তারা মনে করছে ওয়াশিংটনকে চিরতরে পরাস্ত করার এটাই তাদের সর্বশ্রেষ্ঠ সুযোগ।
মোহাম্মদ আয়াতুল্লাহি তাবার টেক্সাস এ অ্যান্ড এম ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক।
ফরেন অ্যাফেয়ার্স থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।
মতামত