মহান আল্লাহ হলেন ‘আর-রাজ্জাক’ বা রিজিকদাতা। পৃথিবীর বুকে বিচরণশীল প্রতিটি প্রাণের সৃষ্টির পাশাপাশি তার খাদ্য ও জীবনধারণের যাবতীয় উপকরণের দায়িত্ব তিনি গ্রহণ করেছেন।
পবিত্র কোরআনে ঘোষিত হয়েছে, ‘ভূপৃষ্ঠে বিচরণকারী এমন কোনো প্রাণী নেই, যার রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহর ওপর ন্যস্ত নয়।’ (সুরা হুদ, আয়াত: ৬)
অন্যত্র মুমিনদের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তোমরা আহার করো সেসব ‘তাইয়িবাত’ (পবিত্র ও পুষ্টিকর বস্তু) থেকে, যা আমি তোমাদের রিজিক হিসেবে দান করেছি।’ (সুরা আ‘রাফ, আয়াত: ১৬০)
তা সত্ত্বেও বিশ্বজুড়ে অনাহার, দারিদ্র্য ও তীব্র পুষ্টিহীনতার প্রাদুর্ভাব কোনো প্রাকৃতিক অপর্যাপ্ততার কারণে নয়; বরং তা মানবসৃষ্ট বৈষম্য, অপচয়, সুষম বণ্টনের অভাব এবং প্রকৃতিতে ছড়িয়ে থাকা আল্লাহর কুদরতি নেয়ামত সম্পর্কে মানুষের উদাসীনতার ফল।
ইসলাম কেবল খাদ্যের পরিমাণের ওপর নয়; বরং খাদ্যের গুণগত মান, আত্মিক বিশুদ্ধতা ও শারীরিক উপযোগিতার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়।
ইসলামি পরিভাষায় ‘তাইয়িবাত’ বলতে এমন আহারকে বোঝায়, যা একাধারে হালাল, অপবিত্রতামুক্ত, স্বাস্থ্যকর ও মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর উপাদান থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ।
আধুনিক বাণিজ্যিক সমাজব্যবস্থা কৃত্রিম ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যকে চাকচিক্যময় বিজ্ঞাপনে উপস্থাপন করে চড়া দামে বিক্রি করছে।
কোরআনের জীবনধারা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আল্লাহ মানুষের আরোগ্য ও পুষ্টির জন্য কৃত্রিম বা ব্যয়বহুল ব্যবস্থার মুখাপেক্ষী করেননি; বরং সহজলভ্য প্রকৃতির বুকেই গচ্ছিত রেখেছেন আরোগ্যের অনুষঙ্গ।
আল্লাহ প্রকৃতিতে এমন কিছু খাদ্য উপাদান ছড়িয়ে দিয়েছেন, যা অল্প পরিমাণে গ্রহণ করলেও শরীরে প্রভূত শক্তি ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করে। এমন ৩টি নেয়ামত হলো।
১. মৌমাছির আহরিত মধু: পবিত্র কোরআনে ‘আন-নাহল’ বা মৌমাছি নামে একটি সুরা আছে, আল্লাহ যেখানে বলেছেন, ‘তাদের (মৌমাছির) পেট থেকে নির্গত হয় বিবিধ রঙের পানীয়, যাতে রয়েছে মানুষের জন্য আরোগ্য (শিফা)।’ (সুরা নাহল, আয়াত: ৬৯)
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা দুটি নিরাময়কারী বস্তুকে আঁকড়ে ধরো: মধু এবং কোরআন।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩৪৫২)
প্রাকৃতিক বিশ্লেষণে, শুধু বিশুদ্ধ মধুই নয়; বরং মৌমাছি সংগৃহীত পরাগরেণু এবং রয়্যাল জেলিও আল্লাহর সেই বিশেষ নেয়ামতের অন্তর্ভুক্ত, যা মানবদেহের রোগ প্রতিরোধক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
২. সামুদ্রিক খাবার: সাগরের বুক থেকে আহরিত খাদ্যের গুরুত্ব তুলে ধরে আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের জন্য সামুদ্রিক শিকার ও তা থেকে প্রস্তুতকৃত খাদ্য হালাল করা হয়েছে—তোমাদের এবং মুসাফিরদের উপকারের জন্য।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত: ৯৬)
সমুদ্র ও স্বাদুপানিতে মানুষের রাসায়নিক সার বা চাষাবাদ ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো নীল-সবুজ শৈবাল এবং সামুদ্রিক উদ্ভিদে আল্লাহ প্রোটিন, আয়রন ও ভিটামিন বি–১২–এর বিপুল ভাণ্ডার গচ্ছিত রেখেছেন। বৈশ্বিক পুষ্টিহীনতা মোচনে এটি পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী এক অলৌকিক ব্যবস্থা।
৩. অঙ্কুরিত শস্য ও উদ্ভিজ্জ পুষ্টি: পবিত্র কোরআনে উদ্ভিজ্জ রিজিক সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘মানুষ তার খাদ্যের দিকে লক্ষ্য করুক! আমিই অঝোর ধারায় বৃষ্টি বর্ষণ করি, এরপর ভূমিকে বিদীর্ণ করি এবং তাতে উৎপন্ন করি শস্য, আঙুর, শাকসবজি...’ (সুরা আবাসা, আয়াত: ২৪-২৮)
অত্যন্ত সুলভ মূল্যের গম থেকে মাত্র কয়েক দিনে অঙ্কুরিত গমঘাস কিংবা মাটির গভীর থেকে খনিজ শুষে নেওয়া আলফালফা প্রাকৃতিকভাবে তৈরি পুষ্টির খনি। সামান্য খরচে বিপুল পুষ্টি গচ্ছিত রেখে আল্লাহ প্রমাণ করেছেন যে সাধারণ মানুষের জন্যও পরম স্বাস্থ্যকর খাদ্যের দুয়ার তিনি উন্মুক্ত রেখেছেন।
ইসলামের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো ‘হিফজুন নাফস’ বা মানবজীবনের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করা। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ এমন কোনো ব্যাধি নাজিল করেননি, যার আরোগ্য তিনি অবতীর্ণ করেননি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৬৭৮)
প্রাকৃতিক উপাদানের মাধ্যমে সুস্থতা অনুসন্ধান করা সুন্নতেরই অনুষঙ্গ।
তবে কোরআনে কঠোরভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, ‘তোমরা খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না’ (সুরা আ‘রাফ, আয়াত: ৩১)
মতামত