মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গে ইউক্রেনের সম্পর্ক আবারও টানাপোড়েনের মুখে পড়েছে। রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে আলোচনায় ব্যর্থতার জন্য ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে দায়ী করেছেন ট্রাম্প।
অন্যদিকে, কিয়েভের অভিযোগ, ওয়াশিংটন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সহায়তা আটকে রাখছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ছাড়া রাশিয়ার বিরুদ্ধে কত দিন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে ইউক্রেন?
২০২৫ সালের শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসন ইউক্রেনের জন্য নতুন সহায়তা প্যাকেজ বন্ধ করে দেয়। এরপর থেকে ইউরোপীয় দেশগুলো সহায়তা বাড়িয়ে ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে নিজেদের প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে কিয়েভ। তবে অর্থনৈতিক সহায়তার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য, উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সামরিক যোগাযোগ প্রযুক্তির ওপর ইউক্রেনের নির্ভরতা এখনও অনেক বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে প্রধানত তিনটি উপায় রয়েছে- অর্থনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক। এসব ক্ষেত্রে মার্কিন সহায়তা কমে গেলে ইউক্রেনের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে এতে দেশটির প্রতিরোধের ইচ্ছা ভেঙে পড়বে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়া ইউক্রেনের জন্য যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব নয়। তবে সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখা, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়া এবং রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোকাবিলা করা অনেক বেশি কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
অর্থনৈতিক সহায়তায় বড় ঘাটতি জার্মানির গবেষণা সংস্থা কিল ইনস্টিটিউট ফর দ্য ওয়ার্ল্ড ইকোনমির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে অন্তত ১৩১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা দিয়েছে। এর ফলে ২০২৫ সালে নতুন সহায়তা বন্ধ হওয়ার আগপর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রই ছিল ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় একক দাতা।
অন্যদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্যদেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলো সম্মিলিতভাবে একই সময়ে অন্তত ২২৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা দিয়েছে। সামরিক সহায়তার ক্ষেত্রে জার্মানি, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস ও সুইডেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। ইইউর বাইরে যুক্তরাজ্য ও নরওয়েও ইউক্রেনকে উল্লেখযোগ্য সামরিক সহায়তা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সহায়তা বন্ধ হওয়ার পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন অর্থায়ন বাড়িয়েছে। আগে যেখানে মাসে গড়ে ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দেওয়া হতো, তা বেড়ে ৫ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে যুদ্ধের আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ মিলে মাসে যে ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দিত, তার তুলনায় বর্তমান পরিমাণ এখনও ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার কম।
অর্থাৎ, ইউরোপ সহায়তা বাড়ালেও যুক্তরাষ্ট্রের রেখে যাওয়া ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করতে পারেনি।
এছাড়া ইউরোপের দেশগুলো ইউক্রেনকে যে অস্ত্র দিচ্ছে, তার একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে কেনা। এসব অস্ত্র ইউক্রেনে পাঠানোর ক্ষেত্রে পেন্টাগনের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। ফলে ইউরোপ অর্থায়ন করলেও অস্ত্র সরবরাহের ওপর ওয়াশিংটনের প্রভাব থেকে যাচ্ছে।
ইউক্রেনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টরের ঘাটতি বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। শুক্রবার জেলেনস্কি বলেন, রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ইন্টারসেপ্টর সরবরাহে এখনও বিলম্ব হচ্ছে। আগে সরবরাহের বিষয়ে সম্মতি দেওয়া হলেও সেগুলো হাতে পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর আগের সপ্তাহে ইউক্রেনের প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের মজুত শেষ হয়ে যায়। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সক্ষম প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মধ্যে প্যাট্রিয়ট অন্যতম। ফলে এ ব্যবস্থার গোলাবারুদের ঘাটতি ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষাকে আরও দুর্বল করে তুলেছে।
বৃহস্পতিবার রাতে কিয়েভে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সময় কোনও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা যায়নি। এতে প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের মজুত শূন্য অথবা অত্যন্ত সীমিত পর্যায়ে থাকার আশঙ্কা জোরালো হয়েছে।
জেলেনস্কি সিএনএনকে বলেন, এই সংকটময় মুহূর্তে মিত্রদের কাছে ইউক্রেনের প্রধান দুটি চাওয়া- রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে না নেওয়া এবং ইউক্রেনকে আরও উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র দেওয়া।
বিশ্লেষকদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র কেনা পুরোপুরি বন্ধ বা দীর্ঘ সময়ের জন্য স্থগিত হওয়ার সম্ভাবনা সীমিত। কারণ, এসব অস্ত্রের ক্রয়াদেশ মার্কিন প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর জন্যও বড় ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরি করে।
গোয়েন্দা তথ্য ও স্যাটেলাইট যোগাযোগে নির্ভরতা অর্থনৈতিক সহায়তা কমে গেলেও সামরিক প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ইউক্রেনের নির্ভরতা এখনও অত্যন্ত বেশি।
প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়াও মার্কিন সামরিক যোগাযোগ প্রযুক্তি স্টারশিল্ড এবং উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কীকরণব্যবস্থার বিকল্প ইউক্রেনের হাতে নেই। ইউরোপীয় দেশগুলোরও এ ধরনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের রাশিয়াবিষয়ক কর্মসূচির পরিচালক ম্যাক্স বার্গম্যান বলেন, গত তিন দশক ধরে ইউরোপকে এমন কিছু প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিজস্বভাবে গড়ে তুলতে উৎসাহিত করা হয়নি, কারণ তারা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করতে পারবে বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতার এই বাস্তবতা এখন ইউরোপের জন্য বড় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। মার্কিন সহায়তা বন্ধ বা সীমিত হলে ইউক্রেনের অর্থনীতির ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে, বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি বাড়তে পারে এবং অনেক মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারেন। তবে এতে ইউক্রেনের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মনোবল ভেঙে যাবে বলে তিনি মনে করেন না।
জেলেনস্কি চলতি সপ্তাহের শুরুতে জানিয়েছিলেন, কয়েকটি ঘটনায় ইউক্রেন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আগাম গোয়েন্দা সতর্কতা পায়নি। ফলে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগে সাধারণ মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য সতর্ক করার নিয়মিত ব্যবস্থা ব্যাহত হয়। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের দাবি, এতে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি বেড়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর ও ট্রাম্প গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান সীমিত করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। মঙ্গলবার রাতে জেলেনস্কি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় আবার কার্যকর হয়েছে।
স্টারশিল্ড নিয়ে নতুন উদ্বেগ গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় পুনরায় চালু হলেও স্টারশিল্ড স্যাটেলাইট যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। শুক্রবার জেলেনস্কি ও ইউক্রেনের অন্য কর্মকর্তারা জানান, সেবাটির ওপর বিধিনিষেধ এখনও বহাল রয়েছে। যদিও ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইলন মাস্ক ইউক্রেনের জন্য এ ব্যবস্থায় পূর্ণ প্রবেশাধিকার পুনর্বহাল করেছেন।
স্টারশিল্ড হলো মাস্কের প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের স্টারলিংক প্রযুক্তির সামরিক সংস্করণ। ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগ ও সামরিক কার্যক্রম পরিচালনায় এ ধরনের স্যাটেলাইট সংযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের দাবি, সেবাটির গতিসীমা বা ব্যবহারে বিধিনিষেধের কারণে দ্রুতগতির সামরিক সরঞ্জাম পরিচালনায় সমস্যা হচ্ছে। রুশ হামলা প্রতিহত করতে ব্যবহৃত ইউক্রেনের ইন্টারসেপ্টর ড্রোনের কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। যুদ্ধের সম্মুখসারির বিভিন্ন এলাকায় সামরিক অভিযান পরিচালনায় এর প্রভাব পড়েছে।
সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি বলেন, আত্মরক্ষার জন্য ইউক্রেন স্বাভাবিক গতিতে স্টারশিল্ড ব্যবহারের সুযোগ চায়। ইউরোপীয় মিত্ররা স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের চুক্তির অর্থ পরিশোধ করছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তবে এ সুবিধা না পেলেও ইউক্রেন টিকে থাকবে এবং শক্তিশালী থাকবে বলে মন্তব্য করেন জেলেনস্কি।
ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা স্টারশিল্ড ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপের সিদ্ধান্তে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন। তবে কী কারণে এ সমস্যা তৈরি হয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি তারা।
সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অবগত এক ব্যক্তির বরাতে সিএনএন জানিয়েছে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এক ফোনালাপে ট্রাম্প মাস্ককে ইউক্রেনের জন্য স্টারশিল্ডের পূর্ণ প্রবেশাধিকার পুনর্বহালের অনুরোধ জানান। তবে মাস্ক এককভাবে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি বলেছেন, ব্যবহারের গতি বা পরিসরের সীমা নির্ধারণ করে মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত এসব ব্যবস্থায় নতুন করে কোনও বিঘ্ন বা বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে স্বল্প মেয়াদে ইউক্রেনকে বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে হবে। দীর্ঘ মেয়াদে ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের স্যাটেলাইট ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি উন্নয়নে আরও বেশি অর্থ বিনিয়োগ করতে পারে।
বার্গম্যানের মতে, স্টারশিল্ডের মতো সেবার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের আচরণ শুধু ইউক্রেনের জন্যই নয়, বরং মার্কিন প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা সরবরাহকারীদের ওপর মিত্রদেশগুলোর আস্থার জন্যও বড় প্রশ্ন তৈরি করছে।
রাশিয়ার জন্য কি বাড়তি সুবিধা তৈরি হচ্ছে? যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের বিরোধের প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; এর বড় ভূরাজনৈতিক তাৎপর্যও রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে কিয়েভের সম্পর্কের অবনতি রাশিয়ার জন্য কৌশলগত সুবিধা তৈরি করতে পারে।
চলতি মাসে ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়ার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার আগে তা শিথিল করেছে এবং রাশিয়ার ডিজেল রফতানির সুযোগ তৈরির জন্য একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে। একই সময়ে যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়া তার সর্বোচ্চ দাবিগুলো থেকে সরে আসেনি।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিরক্ষা গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (রুসি) রাশিয়া ও ইউরেশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক নাতিয়া সেস্কুরিয়া বলেন, ইউক্রেনের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নজিরবিহীন চাপ মস্কোকে এমন আশা দিতে পারে যে যুদ্ধ চালিয়ে গেলে একসময় ইউরোপের সমর্থনও দুর্বল হয়ে পড়বে।
নিউ ইউরেশিয়ান স্ট্র্যাটেজিস সেন্টারের আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ববিষয়ক প্রধান জন লফও একই ধরনের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তার মতে, ট্রাম্পের মাধ্যমে ইউক্রেনের ওপর চাপ সৃষ্টি, রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং মার্কিন কংগ্রেসে প্রস্তাবিত লিন্ডসে গ্রাহামের বিল কার্যকর না করার মতো পদক্ষেপ ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মতপার্থক্য আরও স্পষ্ট করছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আটক মার্কিন নাগরিক স্টিফেন হাবার্ডের মুক্তির সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিষয়টি যুক্ত করেছিলেন ট্রাম্প। যদিও এর আগে তিনি দাবি করেছিলেন, হাবার্ডের মুক্তির বিনিময়ে ওয়াশিংটন মস্কোকে কিছু দেয়নি।
ইরান যুদ্ধ ও জ্বালানির দামও হয়ে উঠেছে চাপের কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউক্রেনের সাম্প্রতিক বিরোধের পেছনে জ্বালানির বাজার ও ইরান যুদ্ধের প্রভাবও রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ট্রাম্প রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলার কারণে জ্বালানির দাম বাড়ছে বলে অভিযোগ করেছেন। এতে ইউক্রেন তার প্রশাসনের কাছে চাপ সৃষ্টির সহজ লক্ষ্য হয়ে উঠেছে বলে মনে করেন জন লফ।
তার মতে, ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং যুদ্ধটির প্রতি মার্কিন জনমতের অসন্তোষ ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির বাকি সময়েও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের মধ্যে বর্তমান মতবিরোধ দ্রুত মিটে যাবে- এমন নিশ্চয়তা নেই।
তাহলে কি মার্কিন সহায়তা ছাড়াই লড়তে পারবে ইউক্রেন? বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থ, অস্ত্র ও প্রযুক্তিগত সহায়তার ঘাটতি একসঙ্গে মোকাবিলা করা। ইউরোপের বাড়তি অর্থায়ন কিয়েভকে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সাহায্য করছে। নিজেদের প্রতিরক্ষা শিল্প সম্প্রসারণের উদ্যোগও দীর্ঘ মেয়াদে নির্ভরতা কমাতে পারে।
তবে প্যাট্রিয়টের মতো ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, উন্নত গোয়েন্দা তথ্য এবং সামরিক স্যাটেলাইট যোগাযোগের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প তৈরি করতে সময় লাগবে। এসব সহায়তা বন্ধ বা সীমিত হলে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করা, সামরিক অভিযানের সমন্বয় এবং বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়া আরও কঠিন হবে।
সুতরাং বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়া ইউক্রেনের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব নয়; কিন্তু যুদ্ধের ব্যয়, ক্ষয়ক্ষতি ও ঝুঁকি অনেক বেড়ে যেতে পারে। আর ওয়াশিংটন ও ইউরোপের মধ্যে মতপার্থক্য দীর্ঘস্থায়ী হলে তার সবচেয়ে বড় কৌশলগত সুবিধা পেতে পারে মস্কো। সূত্র: সিএনএন
বিডি প্রতিদিন/একেএ
মতামত