ঢাকা    বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩
দৈনিক জনপদের খবর

ডেমোক্র্যাটদের হাতে কংগ্রেস, বদলে যাচ্ছে মার্কিন রাজনীতির হিসাব

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের চমক দেখিয়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি আসনে জয় পেয়ে কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে দলটি। বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে, সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদে জয় পেয়েছে দলটি। এর মধ্য দিয়ে বারাক ওবামার দ্বিতীয় মেয়াদের পর প্রথমবারের মতো কোনো ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট কংগ্রেসের কোনো কক্ষেই নিজের দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারলেন না। ইতোমধ্যে কয়েকজন ডেমোক্র্যাট নেতা এই ফলাফলকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরাজয় হিসেবে তুলে ধরেছেন। ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন, নির্বাচনী প্রচারে বিরোধীরা তার দলকে ছাড়িয়ে গেছে। ডেমোক্র্যাটরা কীভাবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেল এবং এই ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে তারা কী করতে পারে, তা নিয়ে এ প্রতিবেদন। আরও পড়ুনআরও পড়ুনমার্কিন নির্বাচনে ইতিহাস গড়লেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত মুসলিম তরুণী সিনেটে বড় ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা সিনেটে বেশ কয়েকটি আসনে রিপাবলিকানদের হারিয়ে জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। এর মধ্যে এমন অনেক আসন রয়েছে, যেগুলোতে কয়েক দশক ধরে দলটি জিততে পারেনি। জেমস তালারিকো, টেক্সাস: ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এই অঙ্গরাজ্যে ১৪ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে জিতেছিলেন ট্রাম্প। তিনি অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনকে সমর্থন দিয়েছিলেন। প্যাক্সটনের বিরুদ্ধে আগে জালিয়াতির অভিযোগে মামলা হয়েছিল এবং অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় একবার অভিশংসিতও হয়েছিলেন তিনি। তবে অধিকাংশ ভোট গণনা শেষে প্যাক্সটনকে ১১ শতাংশ পয়েন্টের বেশি ব্যবধানে হারিয়ে দিয়েছেন তালারিকো। ৩২ বছরের মধ্যে টেক্সাসে কোনো অঙ্গরাজ্যব্যাপী নির্বাচনে জয়ী হওয়া প্রথম ডেমোক্র্যাট তিনি। অ্যাডাম হ্যামিলটন, কানসাস: ১৯৯৪ সালের পর টেক্সাসে যে কৃতিত্ব দেখিয়েছেন তালারিকো, কানসাসে তার চেয়েও বড় সাফল্য পেয়েছেন হ্যামিলটন। ট্রাম্পের সমর্থন পাওয়া রিপাবলিকান প্রার্থী রজার মার্শালকে হারিয়েছেন তিনি। কানসাসে সর্বশেষ ১৯৩২ সালে সিনেটের আসনে জয় পেয়েছিল ডেমোক্র্যাটরা। জশ তুরেক, আইওয়া: ২০১৪ সালে আইওয়ায় ১৪ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন ট্রাম্প। তবে এবারের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সিনেট নির্বাচনে চার শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে জয় পেয়েছেন তুরেক। অ্যানি অ্যান্ড্রুজ, সাউথ ক্যারোলাইনা: ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প এই অঙ্গরাজ্যেও বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন। চলতি বছরের শুরুর দিকে মারা যাওয়া ট্রাম্পের মিত্র ও দীর্ঘদিনের সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের আসনটি ছিল এটি। নির্বাচনের আগপর্যন্ত ওই আসনে গ্রাহামের বোন ডার্লিনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ট্রাম্পও তাকে জোরালো সমর্থন দিয়েছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত অন্তত চার শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে জয় পেয়েছেন অ্যান্ড্রুজ। রয় কুপার, নর্থ ক্যারোলাইনা: আগে রিপাবলিকানদের দখলে থাকা আসনটি ডেমোক্র্যাটদের করে নেওয়ার পাশাপাশি বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছেন কুপার। রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক ওয়াটলিকে প্রায় ২০ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে হারিয়েছেন তিনি। ট্রয় জ্যাকসন, মেইন: রিপাবলিকানদের দখলে থাকা আসনটি নিজেদের করে নিয়েছেন জ্যাকসন। প্রায় সাত শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে সুসান কলিন্সকে হারিয়েছেন তিনি। শেরড ব্রাউন, ওহাইও: রিপাবলিকান প্রার্থী জন হুস্টেডকে প্রায় চার শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে হারিয়েছেন ব্রাউন। আবদুল এল-সায়েদ, মিশিগান: এই আসনটি আগে থেকেই ডেমোক্র্যাটদের দখলে ছিল। এবার ট্রাম্প-সমর্থিত রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে হারিয়ে জয় পেয়েছেন এল-সায়েদ। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটর হতে যাচ্ছেন তিনি। প্রতিনিধি পরিষদেও জয় এপির তথ্য অনুযায়ী, ৪৩৫ সদস্যের প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে প্রয়োজনীয় ২১৮টি আসন পেরিয়ে জয় নিশ্চিত করেছে ডেমোক্র্যাটরা। এই জয়ের মধ্যে আগে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির দখলে থাকা কয়েকটি আসনও রয়েছে। সিনেটে জয়ের ঘোষণা আসার কয়েক ঘণ্টা পর প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের খবর জানায় এপি। এর মধ্য দিয়ে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেল দলটি। নির্বাচনে জয় পেলে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধ, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে ট্রাম্প প্রশাসনকে জবাবদিহির আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ডেমোক্র্যাটরা। তবে এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন সহজ হবে না। ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের ক্ষমতা কতটা? আইন প্রণয়ন ও সরকারি ব্যয় অনুমোদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট। তবে কোনো কক্ষই এককভাবে সব সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। আবার দুই কক্ষের কিছু ক্ষমতা রয়েছে, যা অন্যটির নেই। যেমন, প্রেসিডেন্টের শীর্ষ সরকারি পদে মনোনীত ব্যক্তিদের নিয়োগ অনুমোদনের একক ক্ষমতা সিনেটের। সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের মনোনীত রাষ্ট্রদূত, মন্ত্রিসভার সদস্য এবং ফেডারেল বিচারকদের নিয়োগ আটকে দিতে পারবে। এমনকি সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগও এর আওতায় পড়বে। সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বিভিন্ন কমিটির নিয়ন্ত্রণও পায়। এসব কমিটি তদন্ত শুরু করতে পারে, নথিপত্র তলব করতে পারে এবং সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হাজির হওয়ার নির্দেশ দিতে পারে। এ ছাড়া প্রতিনিধি পরিষদে কোনো প্রেসিডেন্ট বা শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা অভিশংসিত হলে তার বিচার পরিচালনার দায়িত্ব পড়ে সিনেটের ওপর। ওই বিচারে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে পদ থেকে অপসারণের সিদ্ধান্তও আসতে পারে। ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে ২০১৯ ও ২০২১ সালে দুবার অভিশংসিত হয়েছিলেন। তবে দুইবারই সিনেটে তিনি নির্দোষ সাব্যস্ত হন। সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও ডেমোক্র্যাটদের ক্ষমতা বাড়াবে। কোনো বিল আইনে পরিণত করতে হলে কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই তা পাস হতে হবে। এরপর সেটিতে প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর প্রয়োজন। তবে ডেমোক্র্যাটদের আইন প্রণয়নের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে ট্রাম্পের ভেটো ক্ষমতা। ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর মতো দ্বিদলীয় সমর্থন থাকা প্রস্তাবও প্রেসিডেন্টের ভেটোর মুখে পড়তে পারে। সোমবার এক পডকাস্টে ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমি সবকিছুতেই ভেটো দেব।’ এতে তার ভেটো ক্ষমতা ব্যাপকভাবে ব্যবহারের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। প্রেসিডেন্টের ভেটো অকার্যকর করতে হলে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট, উভয় কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটদের কিছু রিপাবলিকান সদস্যের সমর্থনও লাগবে। জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির গভর্নমেন্ট অ্যাফেয়ার্স ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো লরা ব্লেসিং মনে করেন, ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস তদন্তের সাংবিধানিক ক্ষমতা সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করবে। আলজাজিরাকে ইমেইলে তিনি বলেন, ‘সময় ব্যয় ও সংবাদপত্রের শিরোনামের হিসাবে ডেমোক্র্যাটরা সবচেয়ে বেশি তৎপরতা দেখাবে তদন্তের ক্ষেত্রেই।’ সিনেটের স্থায়ী তদন্তবিষয়ক উপকমিটিতে বর্তমানে ডেমোক্র্যাটদের জ্যেষ্ঠ সদস্য রিচার্ড ব্লুমেনথাল। মঙ্গলবারের নির্বাচনের ফলাফলের কারণে তিনি ওই কমিটির চেয়ারম্যান হতে পারেন। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে গত সেপ্টেম্বরে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে ব্লুমেনথাল বলেছিলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখতে কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ক্ষমতা কাজে লাগাবেন তারা। তিনি বলেন, ‘আমরা অবশ্যই সমন জারির ক্ষমতা ব্যবহার করব।’ হোয়াইট হাউসের অনুমোদন ছাড়াই কংগ্রেস তদন্ত চালাতে পারে। ফলে এসব তদন্ত ট্রাম্পের জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। গত দুই বছরে ট্রাম্পের পরিবার ক্রিপ্টোকারেন্সি, ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং প্রেডিকশন মার্কেটসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবসার পরিধি বাড়িয়েছে। এ বছর প্রকাশিত আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সম্পদ আনুমানিক ২২০ কোটি ডলার বেড়েছে। ডেমোক্র্যাট সিনেটররা ইতোমধ্যে এ ধরনের তদন্তের প্রস্তুতি শুরু করেছেন। কয়েকজন সিনেটর বিভিন্ন কোম্পানি ও সরকারি দপ্তরে চিঠি পাঠিয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন। এসব চিঠিতে ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসের বলরুম নির্মাণের জন্য ব্যক্তিগত অনুদান সংগ্রহ এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তদন্তের অভিযোগসহ বিভিন্ন বিষয় উঠে এসেছে। তবে সবাই তদন্তে সহযোগিতা করবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা ভবিষ্যতে সিনেটের জারি করা সমন আদালতে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। এতে তদন্ত কয়েক মাস, এমনকি কয়েক বছর পিছিয়ে যেতে পারে। ব্লেসিং মনে করেন, ট্রাম্পের পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্যরা সমনের মুখে হাজির হবেন, এমন সম্ভাবনা কম। তবে সরকারি কর্মচারী এবং ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবেন ডেমোক্র্যাটরা। এর মাধ্যমে ট্রাম্প ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য অনিয়মের তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। তবে এমন তথ্য পাওয়া গেলেই যে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তার নিশ্চয়তা নেই। সম্ভাব্য অপরাধের প্রমাণ প্রসিকিউটরদের কাছে পাঠাতে পারবেন ডেমোক্র্যাটরা। কিন্তু অভিযোগ দায়ের করা হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত নিতে হবে ট্রাম্পের বিচার বিভাগকে। অপরাধের তথ্য পাওয়া গেলে অভিশংসনের উদ্যোগও নেওয়া হতে পারে। তবে এ ধরনের প্রক্রিয়ায় এখন পর্যন্ত কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টকে পদ থেকে সরানো সম্ভব হয়নি। এ কারণে কিছু ডেমোক্র্যাট নেতার মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তদন্তে কতটা সময় ব্যয় করা উচিত, আর কতটা সময় দেওয়া উচিত ভোটারদের সরাসরি প্রভাবিত করে এমন ইস্যুগুলোতে। মঙ্গলবার দ্য হিলকে ডেমোক্র্যাট সিনেটর শেলডন হোয়াইটহাউস বলেন, ‘তদন্তের কাজ কোথায় পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে আমাদের চিন্তাভাবনা ও কৌশলী হতে হবে। একই সঙ্গে মার্কিন পরিবারগুলোর দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলে এমন জরুরি ব্যয়সংকট সমাধানের কাজ থেকে যেন আমরা মনোযোগ হারিয়ে না ফেলি, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।’ আরও পড়ুনআরও পড়ুন১৯৪৬ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কেমন ছিল ক্ষমতাসীনদের ফল? ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস কি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধ করতে পারবে? আগামী ৩ জানুয়ারির আগে সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার নিয়ন্ত্রণ কার্যকর হবে না। ফলে পরবর্তী দুই মাস ইরান যুদ্ধের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসি। তার আশঙ্কা, মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজয়ের প্রতিক্রিয়ায় ডেমোক্র্যাটরা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আগেই ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আরও জোরদার করতে পারেন। পারসি বলেন, ‘অপমান ও পরাজয়ের মুখে তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন, এমন প্রবণতা আমরা দেখেছি।’ ডেমোক্র্যাটরা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতা সীমিত করতে তাদের কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মনে করেন পারসি। এ ক্ষেত্রে যুদ্ধের জন্য অর্থায়ন সীমিত করার উদ্যোগ নিতে পারেন তারা। ট্রাম্প প্রশাসন সামরিক অভিযানের জন্য আগে বরাদ্দ করা অর্থ ব্যয় চালিয়ে যেতে পারবে। তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ থাকায় যুদ্ধের জন্য নতুন করে অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব আটকে দিতে পারে ডেমোক্র্যাটরা। পারসি বলেন, ‘এতে তিনি কত দিন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবেন, তার ওপর সীমাবদ্ধতা তৈরি হবে। যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হলে তাকে যদি নতুন অর্থের প্রয়োজন হয়, তাহলে তা অন্য খাত থেকে সহজে সরিয়ে নেওয়ার মতো সামান্য অর্থের বিষয় নয়।’ তবে বাজেটসংক্রান্ত যেকোনো বিল পাশ করাতে ট্রাম্পের সম্ভাব্য ভেটো মোকাবিলার জন্য পর্যাপ্ত ভোট প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি সামরিক ব্যয় সীমিত করতে ডেমোক্র্যাটরা কতটা আগ্রহী, সেই প্রশ্নও রয়েছে। ব্লেসিং বলেন, মার্কিন সেনাদের দুর্বল করার অভিযোগ ওঠার আশঙ্কায় ঐতিহাসিকভাবেই সামরিক খাতে অর্থায়ন বন্ধ করতে অনিচ্ছুক ডেমোক্র্যাটরা। তবে যুদ্ধ বন্ধে চাপ বাড়ানোর আরও পথ রয়েছে তাদের সামনে। উদাহরণ হিসেবে, সিনেটের নিয়ন্ত্রণ কাজে লাগিয়ে যুদ্ধ পরিচালনা এবং হামলার ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসন আইনের শাসন মেনেছে কি না, তা তদন্ত করতে পারে দলটি। স্বাধীন নজরদারি সংস্থা প্রজেক্ট অন গভর্নমেন্ট ওভারসাইটের নীতিবিষয়ক বিশ্লেষক ডেভিড জানোভস্কি বলেন, ‘কঠোর নজরদারি নিজে থেকে সামরিক অভিযান সীমিত করতে পারবে না। তবে এর মাধ্যমে যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্য এতটাই বাড়তে পারে, যা প্রেসিডেন্ট বা গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা বহন করতে চাইবেন না।’ যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগে ডেমোক্র্যাটরা ঐক্যবদ্ধ হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে পারসির সতর্কবার্তা, ট্রাম্পকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা না করলে রাজনৈতিকভাবে এর পরিণতি ভোগ করতে হতে পারে দলটিকে। তিনি বলেন, ‘তখন এটি আর শুধু ট্রাম্পের যুদ্ধ থাকবে না। তারাও এর অংশীদার হয়ে যাবে। কারণ, যুদ্ধ বন্ধের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তারা কিছু না করলে এর দায় তাদের ওপরও বর্তাবে।’ মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ভোটারদের কাছে অর্থনৈতিক সংকট ছিল অন্যতম প্রধান উদ্বেগের বিষয়। অর্থনৈতিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইকোনমিক অ্যান্ড পলিসি রিসার্চের সহপ্রতিষ্ঠাতা অর্থনীতিবিদ ডিন বেকার মনে করেন, এই উদ্বেগ কমাতে ডেমোক্র্যাটদের সবচেয়ে বড় পদক্ষেপগুলোর একটি হতে পারে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে উদ্যোগ নেওয়া। ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সীমিত করেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি ও সার বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ। বেকারের মতে, যুদ্ধ পরিচালনায় ট্রাম্প প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে সিনেটে তদন্ত শুরু হলে যুদ্ধ বন্ধের রাজনৈতিক চাপ বাড়তে পারে। এর ফলে জ্বালানি তেলের দাম কমতে পারে এবং পারিবারিক ব্যয়ের ওপর চাপ কিছুটা প্রশমিত হতে পারে। স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় কমানোর উদ্যোগও নিতে পারে ডেমোক্র্যাটরা। ২০২৫ সালে সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা আইন বা অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্টের বর্ধিত ভর্তুকির মেয়াদ শেষ হওয়ায় অনেক মার্কিন নাগরিককে স্বাস্থ্যবিমার জন্য বেশি প্রিমিয়াম দিতে হচ্ছে। ডেমোক্র্যাটরা এসব ভর্তুকি পুনর্বহালের চেষ্টা করতে পারে। পাশাপাশি নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি মেডিকেইডে করা কাটছাঁটও প্রত্যাহারের উদ্যোগ নিতে পারে তারা। বেকার বলেন, সরকারি ব্যয় নিয়ে আলোচনার সময় এসব পদক্ষেপে রিপাবলিকানদের সম্মত করতে চাপ দিতে পারে ডেমোক্র্যাটরা। দ্বিদলীয় সমর্থন ও ব্যাপক জনসমর্থন থাকায় স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় কমানোর উদ্যোগে ট্রাম্পের ভেটো দেওয়া রাজনৈতিকভাবে কঠিন হতে পারে। ডেমোক্র্যাটদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তারা এমন রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, যাতে ট্রাম্প বিলটিতে ভেটো দিতে না চান।’ ট্রাম্পের আরোপ করা শুল্কও প্রত্যাহারের চেষ্টা করতে পারে ডেমোক্র্যাটরা। তবে এ জন্য প্রতিনিধি পরিষদের সমর্থন এবং ট্রাম্পের অনুমোদন অথবা তার ভেটো অকার্যকর করার মতো পর্যাপ্ত ভোট প্রয়োজন হবে। এমন উদ্যোগ সফল হলেও পণ্যের দাম রাতারাতি কমবে না। প্রগতিশীল অর্থনৈতিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান গ্রাউন্ডওয়ার্ক কোলাবরেটিভের নীতি ও প্রচারবিষয়ক প্রধান অ্যালেক্স জ্যাকেজ বলেন, ‘দাম রকেটের মতো দ্রুত ওপরে ওঠে, কিন্তু পালকের মতো ধীরে নিচে নামে।’ তবে ট্রাম্পের অনুমোদন ছাড়াও উচ্চমূল্য মোকাবিলায় ডেমোক্র্যাটদের আরেকটি পথ রয়েছে। সিনেটের বিভিন্ন কমিটির নিয়ন্ত্রণ কাজে লাগিয়ে মুদি পণ্য, বাড়িভাড়া থেকে শুরু করে বিদ্যুতের বাড়তি বিলসহ বিভিন্ন বিষয়ে কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে তদন্ত করতে পারে তারা। জ্যাকেজ আলজাজিরাকে বলেন, ‘কমিটির নেতৃত্বের ক্ষমতা হাতে থাকা এবং কোম্পানির প্রধান নির্বাহীদের সমন জারি করে কংগ্রেসে হাজির করার মাধ্যমে বাস্তব পরিবর্তন আনার অনেক নজির রয়েছে।’

ডেমোক্র্যাটদের হাতে কংগ্রেস, বদলে যাচ্ছে মার্কিন রাজনীতির হিসাব