ঢাকা    রোববার, ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩
দৈনিক জনপদের খবর

ইরানের হামলা: প্রকাশ্যে এলো মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ধ্বংসচিত্র

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দুই ডজনের বেশি সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালানোর সময় ইরানের প্রধান লক্ষ্য ছিল আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও আগাম সতর্কীকরণ রাডার। এসব ব্যবস্থা ধ্বংস বা অকার্যকর করার পর বিমান রাখার হ্যাঙ্গার, সামরিক সরঞ্জামের গুদাম, সেনাদের আবাসনসহ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালায় তেহরান। এতে কয়েকশ ভবন ও সামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। মার্কিন সামরিক সরঞ্জামের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে কয়েকশ কোটি ডলারে। বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ এবং আঞ্চলিক সামরিক কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এসব তথ্য উঠে এসেছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্যাটেলাইট চিত্র ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলোর ক্ষয়ক্ষতি স্বাধীনভাবে যাচাই করেছে সংস্থাটি। পাশাপাশি হামলার বিষয়ে সরাসরি তথ্য জানা চার আঞ্চলিক কর্মকর্তার সঙ্গেও কথা বলেছে এপি। সংস্থাটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আগস্ট পর্যন্ত ইরান অথবা ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ১১৫টির বেশি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দায় স্বীকার করেছে। এসব হামলায় ২৬টি সামরিক ঘাঁটি ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সরঞ্জাম থাকা অন্যান্য স্থাপনার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। হামলার শুরুতে ইরান বিমান রাখার হ্যাঙ্গার এবং শত্রুপক্ষের আক্রমণ শনাক্ত করার ব্যবস্থাগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়। এরপর গুদাম, সেনাদের আবাসন ও ঘাঁটির অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালায়। এতে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির চিত্র উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে গেছে। দুই আঞ্চলিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরানের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে অনেক সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে নিয়েছে। এর মধ্যে যুদ্ধবিমান, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, যোগাযোগ সরঞ্জাম এবং সামরিক ঘাঁটি পরিচালনার প্রয়োজনীয় বিভিন্ন উপকরণ রয়েছে। এসব সরঞ্জামের অনেকগুলোই অন্যত্র স্থানান্তর করা হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে হামলার বিষয়টি বিবেচনা করছেন। অন্যদিকে তেহরানও বড় ধরনের পাল্টা আঘাতের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নতুন করে সংঘাত শুরু হলে এসব স্থাপনায় আরও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কাও রয়েছে। যুদ্ধ শেষে যুক্তরাষ্ট্র ঘাঁটি ও সামরিক সরঞ্জাম পুনর্গঠন করবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এপির বিশ্লেষণে যুদ্ধের আট মাসে ইরানের পাল্টা হামলার কৌশল এবং মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোর ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত চিত্র উঠে এসেছে। পেন্টাগনের মহাপরিদর্শকের দপ্তরসহ বিভিন্ন স্বাধীন পর্যালোচনায় প্রকাশিত তথ্যের বাইরেও এতে নতুন কিছু বিষয় উঠে এসেছে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুনের মধ্যে ইরানের হামলায় মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে শত শত ভবন ও অন্যান্য স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। সংঘাতে হতাহত ও সামরিক সরঞ্জামের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন ও সামরিক বাহিনী খুব কম তথ্য প্রকাশ করেছে। এমনকি স্যাটেলাইট চিত্র প্রকাশে বিলম্বের কারণে বাইরের পক্ষের জন্য ক্ষয়ক্ষতি পর্যালোচনা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে এ ধরনের বিশ্লেষণই সংঘাতের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র জানার অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক অভিযান পরিচালনাকারী সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ঘাঁটি ও সামরিক সরঞ্জামের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। সামরিক কার্যক্রমের নিরাপত্তার বিষয়টি উল্লেখ করে সাধারণত এ ধরনের তথ্য প্রকাশ থেকে বিরত থাকে সংস্থাটি। এ প্রতিবেদন নিয়েও কোনো মন্তব্য করেনি তারা। কুয়েতের ঘাঁটিগুলোতে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইরানের হামলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো। এ ছাড়া বাহরাইন, ইরাক, জর্ডান, ওমান, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মার্কিন ঘাঁটিগুলোও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। ইরান যুদ্ধের মধ্যে মার্কিন সেনাদের ওপর সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলার ঘটনাটি ঘটে কুয়েতে। ১ মার্চ পোর্ট শুয়াইবা বন্দরে ড্রোন হামলায় ছয় মার্কিন সেনা নিহত হন। কুয়েতের আলি আল সালেম বিমানঘাঁটিতে অন্তত ৩০ বার হামলা চালানো হয়েছে। এতে অন্তত ১৫টি বিমান রাখার হ্যাঙ্গার, বেশ কয়েকটি গুদাম এবং আবাসিক এলাকার কাছাকাছি ১০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। দেশটির আরেকটি মার্কিন সামরিক স্থাপনা ক্যাম্প বুহরিংয়ে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা ছিল আরও বেশি। ইরানের হামলায় ঘাঁটির অধিকাংশ হ্যাঙ্গার ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। সেখানে যুদ্ধবিমানের সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকায় সেনাদের সমাবেশ ও বিনোদনের স্থানগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মার্চে ঘাঁটির একটি জিমনেসিয়াম ধ্বংস হয়। জুলাইয়ের শেষ দিকে সেনাদের কেনাকাটার জন্য থাকা একটি দোকানেও হামলা চালানো হয়। দুই আঞ্চলিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হামলায় ঘাঁটির গাড়ি রাখার গ্যারেজ ও খাবার ঘরও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশের কারণে নাম গোপন রাখার শর্তে তারা এপিকে এসব তথ্য দিয়েছেন। তাদের সঙ্গে কথা বলা অন্য দুজনও আঞ্চলিক সামরিক কর্মকর্তা। যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ইরানের সামরিক সরঞ্জামের ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেশি হলেও মার্কিন বাহিনীর সরঞ্জাম হারানো ছিল অনিবার্য বলে মনে করেন র‌্যান্ড স্কুল অব পাবলিক পলিসির জাতীয় নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিচালক রাফায়েল কোহেন। তার মতে, আধুনিক যুদ্ধের ধরন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তুলনামূলক কম খরচের ড্রোনের বড় ধরনের হামলার ঝুঁকিতে বিশ্বের যেকোনো দেশের সামরিক বাহিনী রয়েছে। বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সতর্কবার্তা হওয়া উচিত। রাডার ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় প্রথম আঘাত যুদ্ধ শুরুর পর ইরান প্রথমেই শত্রুপক্ষের হামলা শনাক্ত ও প্রতিহত করার ব্যবস্থাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে। এসব ব্যবস্থায় নির্ভুল হামলার পর মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে কার্যকর ও বসবাসের অনুপযোগী করে তুলতে অন্যান্য স্থাপনায় হামলার পরিধি বাড়ায়। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুদ্ধ শুরুর প্রথম দুই দিনের মধ্যেই কুয়েতের ক্যাম্প আরিফজান এবং বাহরাইনের নৌ-সহায়তা কার্যক্রমের স্থাপনায় মার্কিন রাডার সুরক্ষায় ব্যবহৃত কাঠামো ধ্বংস করে ইরান। এ ছাড়া সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি এবং জর্ডানের মুয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে থাকা বহনযোগ্য রাডারেও হামলা চালানো হয়। প্রযুক্তিগত গোয়েন্দা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আর্মামেন্ট রিসার্চ সার্ভিসেসের পরিচালক এন আর জেনজেন-জোনস বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত আগাম সতর্কীকরণ রাডারগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে লক্ষ্যবস্তু করেছিল ইরান। এসব রাডার মেরামত বা প্রতিস্থাপন করা অত্যন্ত কঠিন ও ব্যয়বহুল। জর্ডানে একটি রাডারে হামলা চালিয়ে সেটি ধ্বংস করা হয়েছে বলে জানা গেছে। নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রেথিয়নের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে মার্কিন সেনাবাহিনীর কাছে এ ধরনের রাডার রয়েছে মাত্র ১৩টি। বাজেটসংক্রান্ত নথিতে প্রতিটি রাডারের দাম প্রায় ৫০ কোটি ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কাতারে থাকা আরেকটি রাডারও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে সেটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ২০১৩ সালে ১১০ কোটি ডলারের একটি চুক্তির আওতায় উপসাগরীয় দেশটি রাডারটি কিনেছিল। ওই অঞ্চলে এ ধরনের এটিই একমাত্র রাডার বলে ধারণা করা হচ্ছে। জেনজেন-জোনসের মতে, এসব স্থাপনায় হামলার মূল উদ্দেশ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের পরবর্তী হামলা শনাক্ত এবং প্রতিহত করার সক্ষমতা দুর্বল করে দেওয়া। রাডারগুলোতে হামলার পর যুদ্ধের প্রথম মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সরঞ্জাম থাকা ১৮টি স্থাপনায় ৫০টির বেশি সফল হামলা চালায় ইরান। এসব হামলায় বিমান রাখার এলাকাগুলোকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। বিমান, জ্বালানি ও সেনাদের আবাসন ক্ষতিগ্রস্ত দুই আঞ্চলিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিভিন্ন ঘাঁটিতে ইরানের হামলায় জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান, যোগাযোগব্যবস্থা, জ্বালানি সংরক্ষণাগার এবং সেনাদের আবাসন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মার্চে সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে ইরানের হামলায় বোয়িং ই-৩ সেন্ট্রি নজরদারি বিমানের পেছনের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সময়ে রিয়াদে মার্কিন দূতাবাসের একটি সিআইএ ইউনিটেও হামলা চালানো হয়। সম্প্রতি সৌদি বিমানঘাঁটিটি পরিদর্শন করা আরেক আঞ্চলিক সামরিক কর্মকর্তা সেখানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন দেখতে পান। চারদিকে ছড়িয়ে ছিল ধ্বংসাবশেষ ও ভাঙা নির্মাণসামগ্রী। বোমার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যারাক, খাবার ঘর এবং বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জামও তার চোখে পড়ে। ওই কর্মকর্তা আরও জানান, নজরদারি বিমানটিতে আঘাত হানা হামলায় আরও কয়েকটি বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী দুটি ট্যাংকার বিমানও ছিল। অক্টোবরে হালনাগাদ করা মার্কিন কংগ্রেসের গবেষণা বিভাগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে মোট ১৫টি বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত আল ধাফরা বিমানঘাঁটিতেও যুদ্ধের শুরুর দিকে ধারাবাহিক হামলা চালানো হয়। ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে সরাসরি অবগত আরেক আঞ্চলিক সামরিক কর্মকর্তা জানান, সেখানে বিমান রাখার হ্যাঙ্গারসহ বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে আগাম সতর্কীকরণ রাডার ও নজরদারি ড্রোনের মতো সামরিক সরঞ্জামেও আঘাত হানা হয়েছে।

ইরানের হামলা: প্রকাশ্যে এলো মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ধ্বংসচিত্র