মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার নিশ্চিতে কাজ করবে সংসদীয় ককাস
মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, তথ্য জানার অধিকার ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করতে কাজ করবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নবগঠিত মানবাধিকার ও শান্তিবিষয়ক সংসদীয় ককাস।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা চিহ্নিত করার পাশাপাশি সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করার বিষয়েও নজর রাখবে এই ককাস।
বুধবার (৪ নভেম্বর) জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে ককাসের প্রথম বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা জানান এর সভাপতি অ্যাডভোকেট ফাহিমা নাসরিন।
তিনি বলেন, মানুষ যেন স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারে, নিজের মত প্রকাশ করতে পারে, প্রয়োজনীয় তথ্য জানতে পারে এবং নিরাপদে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে, তা নিশ্চিত করাই ককাসের মূল লক্ষ্য। সংসদের ভেতরে ও বাইরে মানবাধিকার-সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করবে এটি।
সংসদ ভবনের টানেলে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে ফাহিমা নাসরিন বলেন, অতীতের শাসনামলে দেশে গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। এনকাউন্টারের নামে লাশ নদীতে ফেলে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনা দেশ-বিদেশে আলোচিত হয়েছে। বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জনগণের প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানো এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় কাজ করবে এই ককাস।
তিনি জানান, প্রথম বৈঠকে মূলত ককাসের কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এই প্রথম মানবাধিকারবিষয়ক সংসদীয় ককাস গঠন করা হয়েছে। বৈঠকে সদস্যরা মানবাধিকার লঙ্ঘন, আইনের শাসন ও বিচারব্যবস্থাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে মতবিনিময় করেন।
নিয়মিত বৈঠকের মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর ভূমিকা রাখার আশাবাদ ব্যক্ত করেন ককাস সভাপতি। তিনি বলেন, নির্বাহী বিভাগের বাইরে থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করে মানুষের মতামত ও প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাতে চায় এই ককাস।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের যেকোনো ঘটনা মোকাবিলায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি আইন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে বলেও জানান তিনি।
ককাসের প্রথম বৈঠকে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালসহ সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরী, সাঈদ আল নোমান, মীর আহমাদ বিনকাসেম, মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান, মো. আবুল হাসনাত, জহরত আদিব চৌধুরী, সানজিদা ইসলাম ও আন্না মিনজ অংশ নেন।
বৈঠকে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, অতীতে যারা মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছেন এবং যারা এর শিকার হয়েছেন, তাঁদের শনাক্ত করে একটি গ্রহণযোগ্য চিত্র তুলে ধরতে হবে। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে, সে লক্ষ্যে সতর্কতা ও সচেতনতার সঙ্গে কাজ করতে হবে।
মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীরা যাতে ভুক্তভোগী হিসেবে নিজেদের উপস্থাপনের চেষ্টা করতে না পারেন, সে বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আহ্বান জানান তিনি।
ডেপুটি স্পিকার নির্বাহী বিভাগকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করে ককাসের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এই ককাসকে কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে সবাইকে দলগতভাবে কাজ করতে হবে। এ লক্ষ্যে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও সহযোগিতা প্রয়োজন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী মানবাধিকার পরিস্থিতি তুলে ধরে ফাহিমা নাসরিন বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নতুন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাত্র ৩৬ দিনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত এবং ৩০ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন। আহতদের অনেকে স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। এমনকি শিশুদেরও গুলি করে হত্যার ঘটনা ঘটেছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সময়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কোনো ঘটনা ঘটলে তার কারণ ও প্রেক্ষাপট খতিয়ে দেখবে ককাস। এতে সরকারি ও বিরোধী দলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সংসদ সদস্যরা রয়েছেন। এটি শুধু সরকারি দলের সদস্যদের নিয়ে গঠিত নয়। মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা চিহ্নিত করার পাশাপাশি সুষ্ঠু তদন্ত, বিচার এবং বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, সেদিকেও নজর রাখবে ককাস।
ককাসের কর্মপরিধি সম্প্রসারণের লক্ষ্যে মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থা, সংগঠন এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার বিষয়ে বৈঠকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি এ বিষয়ে সভা, সেমিনার ও গবেষণামূলক কার্যক্রমে ককাসের সদস্যদের অংশগ্রহণের ওপর জোর দেওয়া হয়।
পরবর্তী প্রজন্মের জন্য স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সরকার এবং নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখার আশাবাদ ব্যক্ত করেন ককাসের সদস্যরা।
বৈঠকে জাতীয় সংসদ সচিবালয়, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।