ঢাকা    রোববার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২ ভাদ্র ১৪৩৩
দৈনিক জনপদের খবর

মস্কোতে হঠাৎ মার্কিন দূতদের আনাগোনা: তোষণ নাকি নতুন ভূ-রাজনৈতিক চাল

দীর্ঘ সাড়ে চার বছর ধরে চলা ইউক্রেন যুদ্ধ যখন চরম স্থবিরতায় রূপ নিয়েছে, ঠিক তখনই ওয়াশিংটন ও মস্কোর মধ্যে এক অভূতপূর্ব কূটনৈতিক যোগাযোগ দেখা যাচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন রাশিয়ার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে পর্দার আড়ালে এবং প্রকাশ্যে একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শুরু করেছে। ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং তাঁর জামাতা জ্যারেড কুশনারের মস্কো সফর, মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) পরিচালক জন র‍্যাটক্লিফের গোপন বৈঠক এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে রুশ অর্থমন্ত্রীর আকস্মিক উপস্থিতি—সব মিলিয়ে বিশ্বরাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত মিলছে। কূটনৈতিক মহল ও পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর ভেতরে এখন একটি প্রশ্ন বেশ জোরালো হয়ে উঠেছে যে—ট্রাম্প কি আবার ভ্লাদিমির পুতিনকে তোষণ বা তুষ্ট করার রাজনীতি শুরু করেছেন? নাকি এটি ওয়াশিংটনের কোনো নতুন ভূ-রাজনৈতিক চাল? শনিবার (৫ আগস্ট) স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার বিশেষ বিমানে রাশিয়ার রাজধানী মস্কোয় অবতরণ করেন। বিমানবন্দরে তাঁদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান রুশ প্রেসিডেন্টের বিশেষ প্রতিনিধি কিরিল দিমিত্রিভ। জানা গেছে, মার্কিন প্রতিনিধি দলটিকে বিমানবন্দর থেকে সরাসরি ক্রেমলিনের উদ্দেশে নিয়ে যাওয়া হয়। এই সফরের পেছনে রয়েছে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে একদম নতুন ও একটি সুনির্দিষ্ট শান্তি প্রস্তাব, যা ওভাল অফিসে ট্রাম্প স্বয়ং অনুমোদন করেছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের এই তৎপরতার কয়েক দিন আগেই সিআইএ পরিচালক জন র‍্যাটক্লিফ অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে মস্কো সফর করেন এবং রাশিয়ার উচ্চপদস্থ গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। যদিও ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ জানিয়েছেন, র‍্যাটক্লিফের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট পুতিনের সরাসরি দেখা হয়নি, তবে ট্রাম্প এই বৈঠককে যুদ্ধ বন্ধের একটি ইতিবাচক প্রয়াস বলে অভিহিত করেছেন। অবশ্য উইটকফ-কুশনারের সঙ্গে পুতিন বৈঠক করেছেন। একই সময়ে, ইউক্রেনে পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান শুরুর পর এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনা অঙ্গরাজ্যে আয়োজিত জি-২০ অর্থমন্ত্রীদের বৈঠকে সরাসরি অংশ নিয়েছেন রাশিয়ার অর্থমন্ত্রী আন্তন সিলুয়ানভ। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের সঙ্গে তাঁর পার্শ্ববৈঠক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপগুলোকে কেবল ‘পুতিনকে তোষণ’ বা ‘নমনীয়তা’ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর পেছনে ট্রাম্পের নিজস্ব ‘লেনদেনভিত্তিক’ পররাষ্ট্রনীতি এবং মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌশলগত বিষয় কাজ করছে। প্রথমত, ইউক্রেন যুদ্ধ দ্রুত অবসানের বাধ্যবাধকতা। দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করার সময় ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি ইউক্রেন যুদ্ধ দ্রুত থামাবেন। কিন্তু গত পাঁচ বছরে রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় পক্ষই ভূখণ্ডের দাবিতে অনড় অবস্থান নেওয়ায় কোনো কূটনৈতিক অগ্রগতি হয়নি। কিয়েভ কিংবা মস্কো কেউই নিজেদের দাবি থেকে পিছপা না হওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসন এখন সরাসরি সর্বোচ্চ পর্যায়ে চাপ প্রয়োগ ও মধ্যস্থতার পথ বেছে নিয়েছে। দ্বিতীয়ত, বেইজিং-মস্কো-তেহরান অক্ষ ভাঙার চেষ্টা। পেন্টাগন ও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাবিষয়ক নীতিনির্ধারকদের সবচেয়ে বড় ভীতি হলো—রাশিয়াকে যদি পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে সম্পূর্ণ কোণঠাসা ও বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়, তবে ক্রেমলিন বাধ্য হয়ে চীন ও ইরানের ওপর শতভাগ নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হয়েছে এবং লোহিত সাগরে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি জোরদার করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র চায় না যে, রাশিয়া তেহরানকে কোনো প্রকার উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট ডেটা বা ক্ষেপণাস্ত্র সহায়তা দিক। সিআইএ পরিচালকের বৈঠকেও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়। তৃতীয়ত, ন্যাটোর সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ ও ভুল বোঝাবুঝি এড়ানো। অতি সম্প্রতি যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি ন্যাটো সদস্য দেশ ইউক্রেনকে যেসব দূরপাল্লার সমরাস্ত্র সরবরাহ করেছে, তা ব্যবহার করে রাশিয়ার ভেতরে প্রধান প্রধান তেল শোধনাগার এবং বাণিজ্যিক হাবগুলোতে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। এর জবাবে মস্কো সরাসরি যুক্তরাজ্যকে ‘ভয়াবহ পরিণতি’ ভোগ করার হুমকি দেয়। ওয়াশিংটন আশঙ্কা করছে, ইউক্রেনকে অতিরিক্ত সমর্থন দিতে গিয়ে ন্যাটো সরাসরি রাশিয়ার সঙ্গে পরমাণু যুদ্ধের মুখোমুখি হতে পারে। এই ধরনের সামরিক ভুল বোঝাবুঝি বা অপ্রত্যাশিত সংঘাত এড়াতেই ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়া ও ন্যাটোর মধ্যকার হটলাইন এবং সামরিক যোগাযোগ সচল রাখতে চাচ্ছে। এদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের মস্কোর প্রতি নরম অবস্থান ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং ন্যাটোর পূর্ব ইউরোপীয় সদস্য দেশগুলোর মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও ভীতির সৃষ্টি করেছে। ইউক্রেন, পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া এবং অন্যান্য বাল্টিক রাষ্ট্রগুলো মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়াকে প্রতিপক্ষের বদলে ‘অংশীদার’ হিসেবে বিবেচনা করা শুরু করেছে, যা ন্যাটোর মূল অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি। পোল্যান্ডের অর্থমন্ত্রী আন্দ্রেজ ডোমানস্কি জি-২০ আসরে রুশ অর্থমন্ত্রীর উপস্থিতি নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা রাশিয়াকে একচুলও বিশ্বাস করি না। তারা ক্রমাগত মিথ্যা বলে। তাদের সঙ্গে যেকোনো আলোচনায় সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।’ একইভাবে ইউরোপীয় বাণিজ্য কমিশনার ভালদিস ডোমব্রোভস্কিস বলেছেন, রাশিয়ার উপস্থিতি এভাবে ‘স্বাভাবিক’ করার এটি কোনো উপযুক্ত সময় নয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ও চ্যাথাম হাউসের জ্যেষ্ঠ ফেলো কিয়ার জাইলসের মতে, ট্রাম্পের এই ধরনের কূটনৈতিক নমনীয়তা পুতিনকে আরও দুঃসাহসী করে তুলতে পারে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘রাশিয়া যদি মনে করে যে, ট্রাম্পের অধীনে আমেরিকা ন্যাটো মিত্রদের রক্ষায় এগিয়ে আসবে না, তবে ক্রেমলিন খুব শিগগিরই ইউরোপের অন্য কোনো দেশের সার্বভৌমত্বে আঘাত হানতে দ্বিধা করবে না।’ তবে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ দূতদের এই দৌড়ঝাঁপের মাঝেও ইউক্রেনের যুদ্ধের তীব্রতা একটুও কমেনি। গত কয়েক সপ্তাহে রাশিয়া ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ এবং জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে টানা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীও রাশিয়ার সীমান্তঘেঁষা অবকাঠামো ও সরবরাহ ব্যবস্থায় ড্রোন হামলা অব্যাহত রেখেছে। পুতিনের মুখপাত্র ক্রেমলিন থেকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, ইউক্রেনকে তাদের পূর্বে ঘোষিত চারটি অঞ্চল বা ভূখণ্ডের দাবি ত্যাগ করতে হবে এবং ন্যাটো জোটে যোগ দেওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা চিরতরে পরিত্যাগ করতে হবে। অন্যদিকে, কিয়েভের দাবি, সার্বভৌম কোনো ভূখণ্ড রাশিয়ার হাতে তুলে দিয়ে কোনো শান্তি চুক্তি তারা মেনে নেবে না। সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের বিশেষ দূতরা মস্কো সফর শেষ করে রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) কিয়েভে পৌঁছানোর কথা থাকলেও, দুই দেশের অনড় ও বিপরীতমুখী অবস্থানের মুখে যুক্তরাষ্ট্রের এই বিশেষ শান্তি প্রস্তাব কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েই যাচ্ছে। তবে ট্রাম্পের এই ঝটিকা কূটনীতি যে বিশ্বরাজনীতির সমীকরণ নতুন করে লিখতে শুরু করেছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। উল্লেখ্য, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবের পর কিয়েভে তিন দিনের জন্য সব ধরনের হামলা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) ক্রেমলিন এ ঘোষণা দেয়। এর আগে শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) জেলেনস্কি রাশিয়ার উদ্দেশে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, মার্কিন দূতদের সফর এবং আলোচনার পুরো সময় ইউক্রেন আকাশপথে কোনো হামলা চালাবে না, একইভাবে রাশিয়াকেও কিয়েভে বিমান হামলা বন্ধ রাখতে হবে। আল জাজিরা থেকে অনুবাদ করেছেন জগৎপতি বর্মা

মস্কোতে হঠাৎ মার্কিন দূতদের আনাগোনা: তোষণ নাকি নতুন ভূ-রাজনৈতিক চাল