ঢাকা    বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩
দৈনিক জনপদের খবর

জাপানের তোইয়ামা যেভাবে শহরকে মানুষের কাছে আনছে

জাপানের অনেক আঞ্চলিক শহর যখন জনসংখ্যা হ্রাস, প্রবীণ নাগরিকের সংখ্যা বৃদ্ধি ও ব্যক্তিগত গাড়িনির্ভর নগর বিস্তারের চাপ সামলাতে নতুন পথ খুঁজছে, তখন তোইয়ামা সিটি ভিন্ন এক নগর ভাবনা সামনে এনেছে। কার্যকর গণপরিবহন, পরিকল্পিত আবাসন নীতি ও ডিজিটাল নাগরিক সেবার সমন্বয়ে শহরটি প্রমাণ করতে চাইছে—কম মানুষ নিয়েও নগরজীবন আরও সংযুক্ত, সহজ ও বাসযোগ্য হতে পারে। তোইয়ামার গল্প এখন শুধু একটি শহরের উন্নয়ন পরিকল্পনা নয়, বরং জাপানসহ বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ নগর-নীতি পাঠ। হোনশু দ্বীপের জাপান সাগর উপকূলে অবস্থিত তোইয়ামা আকারে মাঝারি হলেও পরিচয়ে বহুমাত্রিক। পাহাড়, সমুদ্র, সামুদ্রিক খাদ্য, শিল্প ও সংস্কৃতির টান শহরটিকে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় করেছে। ২০২৫ সালে নিউইয়র্ক টাইমসের ৫২টি শীর্ষ পর্যটন গন্তব্যের তালিকায় থাকা দুই জাপানি শহরের একটি তোইয়ামা; তবে এর নগর পুনরুজ্জীবন কৌশলও এখন সমান আলোচনার বিষয়। তোইয়ামার এই নগর ভাবনা এবং এর প্রয়োগ কাছ থেকে দেখতে সম্প্রতি প্রথম আলোসহ টোকিওভিত্তিক বিদেশি গণমাধ্যমের কয়েকজন প্রতিনিধিকে আমন্ত্রণ জানায় শহর কর্তৃপক্ষ। গত ২৫ আগস্ট সেই সফরে নগর ভবনে সাংবাদিকদের সামনে মেয়র হিরোহিসা ফুজিই তুলে ধরেন শহরের চলমান কমপ্যাক্ট সিটি নীতি ও নতুন স্মার্ট সিটি পরিকল্পনার রূপরেখা। জাপানের অন্যান্য আঞ্চলিক শহরের মতো তোইয়ামার জনসংখ্যা ধীরে ধীরে কমছে। ২০১০ সালে প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজারে পৌঁছানোর পর তা নামতে শুরু করে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজারে নেমে আসতে পারে। অন্যদিকে শহরের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ এখন প্রবীণ। এই বাস্তবতা নগর-পরিকল্পনাকে আরও কঠিন করে তুলেছে, কারণ শহরের অনেক মানুষ থাকেন শহরতলিতে এবং তাঁদের দৈনন্দিন জীবন ব্যক্তিগত গাড়িনির্ভর। এসব কারণে সরকারি সেবা, পরিবহন রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রবীণদের চলাচল—সবই ক্রমে কঠিন হয়ে উঠছিল। এই প্রেক্ষাপটেই শহরটি সিদ্ধান্ত নেয়, নগর কাঠামোকে আবার গণপরিবহন ঘিরে সাজানোর। পুনর্গঠনের কেন্দ্রে রাখা হয় তোইয়ামা এলআরটি বা লাইট রেল ট্রানজিট নেটওয়ার্ককে। এলআরটি হলো পরবর্তী প্রজন্মের ট্রামব্যবস্থা। লক্ষ্য গাড়িনির্ভরতা কমানো এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সেবাকে পায়ে হাঁটার দূরত্বে নিয়ে আসা। সমাধান হিসেবে শুরুতে, যাত্রীসংখ্যা কমে যাওয়া সাবেক জাপান রেলওয়ের তোইয়ামা পোর্ট লাইনকে জাপানের প্রথম পূর্ণাঙ্গ এলআরটি হিসেবে পুনরুজ্জীবিত করা হয়। এর অবকাঠামো নির্মাণে দায়িত্ব নেয় সরকার, আর সেবা পরিচালনায় যুক্ত হয় বেসরকারি খাত। এরপর ধাপে ধাপে বদলে যেতে থাকে শহরের চলাচলের মানচিত্র। ২০০৬ সালের এপ্রিলে চালু হয় তোইয়ামা লাইট রেল, ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে আসে শহরের কেন্দ্রভাগে সেন্ট্রাম লুপ লাইন, ২০১৫ সালের মার্চে শিনকানসেনের উঁচু রেললাইনের নিচ দিয়ে ট্রামলাইন সম্প্রসারিত হয়, আর ২০২০ সালের মার্চে সম্পন্ন হয় উত্তর-দক্ষিণ ট্রাম লাইন সংযোগ। এসব উদ্যোগ তোইয়ামাকে বহুস্তরের গণপরিবহনভিত্তিক নগরে পরিণত করে। উত্তর-দক্ষিণ ট্রাম লাইন সংযোগের পর তোইয়ামা স্টেশন যেন শহরের চলাচলের হৃৎস্পন্দনে পরিণত হয়। এর ফলে এলআরটি, স্থানীয় রেল ও শিনকানসেনের মধ্যে যাত্রী স্থানান্তর (ট্রানজিট) সহজ হয়েছে। পাশাপাশি সেবার মান বাড়াতে আনা হয় কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। ট্রামের সময়ের ব্যবধান কমানো, নতুন স্টেশন নির্মাণ, বয়স্কদের জন্য নিচু মেঝের যান, বাধামুক্ত নকশা, আইসি কার্ডে ভাড়া পরিশোধ এবং অ্যাটেনডেন্টের ব্যবস্থা। ফলও আসে দ্রুত, এক দশকের মধ্যেই কর্মদিবসে ব্যবহার এলআরটি চালুর আগের তুলনায় প্রায় ২ দশমিক ১ গুণ এবং ছুটির দিনে প্রায় ৩ দশমিক ৪ গুণ বেড়ে যায়। এলআরটি উন্নয়ন তোইয়ামায় এক ধরনের ইতিবাচক চক্র তৈরি করে। চলাচল সহজ হওয়ায় বয়স্ক বাসিন্দাসহ আরও বেশি মানুষ শহরের কেন্দ্রে আসতে শুরু করেন। দোকানপাট ও সেবা খাতে গতি আসে; কেন্দ্রস্থলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ে, নগর দৃশ্য উন্নত হয়, জমির মূল্য বৃদ্ধি পায় এবং স্থানীয় সরকারের কর রাজস্বও শক্তিশালী হতে থাকে। প্রায় দুই দশকের কমপ্যাক্ট সিটি নীতির ফল এখন শহরের বসবাসের মানচিত্রেও দৃশ্যমান। গণপরিবহনের সুবিধা থাকা এলাকায় বসবাসকারী মানুষের হার প্রায় ৩০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে। মেয়র এই হার ৪২ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য তুলে ধরেন। সে জন্য শহরের কেন্দ্রস্থলের কাছাকাছি নতুন বাড়ি নির্মাণে ৫ লাখ ইয়েন পর্যন্ত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। গ্র্যান্ড প্লাজা, নান্দনিক নকশায় নির্মিত জাদুঘর ও লাইব্রেরির মতো নাগরিক সুবিধাও শহরের কেন্দ্রকে আবার মানুষের মিলনস্থলে পরিণত করছে। তবে কেন্দ্রের সাফল্যের বাইরে শহরতলির প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। দূরের এলাকার মানুষ কি একইভাবে সুবিধা পাচ্ছেন? এই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নগর কর্তৃপক্ষ শহরতলিকে এখন পরিকল্পনার কেন্দ্রে আনতে চাইছে। মেয়র বলেন, ‘আমরা শহরতলিসহ সব এলাকার মানুষকে রক্ষা করতে চাই। তাই কমপ্যাক্ট সিটি ও স্মার্ট সিটি—দুই পথেই তোইয়ামাকে আরও সুবিধাজনক, টেকসই ও সবার জন্য বাসযোগ্য শহর হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’ এই ভাবনা থেকেই ২০২৬-২০৪৫ মেয়াদের নতুন নগর মহাপরিকল্পনা (মাস্টারপ্ল্যান) প্রণয়ন করেছে তোইয়ামা। পরিকল্পনার লক্ষ্য শুধু পুরোনো সাফল্য ধরে রাখা নয়; বরং সামনে এগিয়ে আসা নতুন বাস্তবতার মোকাবিলা করা। খালি জমি, পরিত্যক্ত বাড়ি, জরাজীর্ণ অবকাঠামো ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি—এসব বিষয়কে এখন শহর ব্যবস্থাপনার বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নতুন পরিকল্পনাতেও ‘হাবকেন্দ্রিক কমপ্যাক্ট সিটি’ ধারণা বহাল রাখা হয়েছে। শহরের ভাষায় এটা অনেকটা ‘স্কিউয়ার্স অ্যান্ড ডাম্পলিংস’ মডেল—যেখানে সুবিধাজনক গণপরিবহন হলো স্কিউয়ার্স, আর হাঁটাচলার উপযোগী ছোট ছোট নগর কেন্দ্র হলো ডাম্পলিংস। অর্থাৎ তোইয়ামা একটি কেন্দ্রের ওপর নির্ভর করতে চায় না; বরং একাধিক কেন্দ্রকে গণপরিবহনের মাধ্যমে যুক্ত করে এমন নগর কাঠামো গড়তে চায়, যেখানে মানুষ কাছাকাছি সেবা পাবে কিন্তু শহর আবার অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত হবে না। এই পর্বে আগের তিন লক্ষ্য—গণপরিবহন পুনরুজ্জীবন, ট্রানজিটমুখী বসবাস উৎসাহিত করা ও শহরের কেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ হাব শক্তিশালীকরণ—এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নগরের স্থান ব্যবস্থাপনাকে আরও দক্ষ করে তোলা। এখানে পরিবর্তনটি গুরুত্বপূর্ণ: তোইয়ামা এখন ভৌত অবকাঠামোর সঙ্গে ডিজিটাল অবকাঠামোকেও একই পরিকল্পনার অংশ করতে চাইছে। তোইয়ামার স্মার্ট সিটি নীতি তাই আলাদা কোনো প্রযুক্তি প্রকল্প নয়; এটি কমপ্যাক্ট সিটিরই পরবর্তী ধাপ। শহরটি এখন ডিজিটাল প্রযুক্তি, প্রশাসনিক তথ্য ও নাগরিক চাহিদাকে এক জায়গায় এনে বিশেষ করে শহরতলির বাসিন্দাদের সেবা ও চলাচলের সঙ্গে যুক্ত রাখতে চাইছে। পরিবহনে এর উল্লেখযোগ্য প্রয়োগ হবে এআইভিত্তিক অন-ডিমান্ড কমিউনিটি বাসে। যাত্রীরা স্মার্টফোনে রাইড বুক করবেন, আর এআই একই দিকে যাওয়া যাত্রীদের মিলিয়ে সবচেয়ে কার্যকর রুট ঠিক করবে। এতে প্রবীণ নাগরিক, গাড়ি ব্যবহার না করা মানুষ এবং দূরের এলাকায় বসবাসকারীদের চিকিৎসা, কেনাকাটা ও প্রশাসনিক কাজে যাতায়াত সহজ হবে। নাগরিক সেবায় ব্যবহৃত হবে জনপ্রিয় ‘লাইন’ অ্যাপ। তোইয়ামার পরিকল্পনায় এটি নাগরিকদের জন্য একধরনের ডিজিটাল প্রবেশদ্বার—যেখান থেকে তথ্য পাওয়া, আবেদন করা, রিজার্ভেশন নেওয়া এবং সমস্যা জানানো যাবে। জরুরি সতর্কতা, দুর্যোগ তথ্য, শিশু লালন-পালনসংক্রান্ত বার্তা, আবর্জনা সংগ্রহের দিন, ভালুক দেখা যাওয়ার সতর্কতা, বাসস্থান সনদের আবেদন, মাই নম্বর কার্ড গ্রহণের সময় নির্ধারণ কিংবা সড়ক-অবকাঠামোর সমস্যা জানানো—সবই ধীরে ধীরে এক প্ল্যাটফর্মে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। তাই তোইয়ামা সিটি প্রযুক্তিকে আলাদা কোনো উদ্যোগ হিসেবে দেখছে না; বরং গণপরিবহন, আবাসন নীতি ও কেন্দ্রভিত্তিক নগর উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত একটি ব্যবহারিক নগর ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি হিসেবে প্রয়োগ করতে চাইছে। তবে প্রযুক্তির এই পথে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে নাগরিকদের অংশগ্রহণ। শহরের প্রায় ৩০ শতাংশ বাসিন্দা প্রবীণ। তাঁরা কতটা সহজে স্মার্টফোনভিত্তিক সেবা ব্যবহার করতে পারবেন, প্রথম আলোর এই প্রশ্নের জবাবে মেয়র জানান, প্রবীণদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে; অনলাইন কেনাকাটা, বুকিং ব্যবস্থা ও ‘লাইন’ অ্যাপ ব্যবহারে সহায়তাও দেওয়া হবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল নোটিশ বোর্ড, কমিউনিটি এসএনএস ও কমিউনিটি সেন্টারকে যুক্ত করে স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনের যোগাযোগ আরও সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তোইয়ামার উদ্যোগগুলো দেখতে দেখতে মনে হয়েছে, এই অভিজ্ঞতা শুধু জাপানের একটি আঞ্চলিক শহরের পরিকল্পনায় সীমাবদ্ধ থাকছে না। জনসংখ্যা কমার চাপ, প্রবীণ নাগরিকের চাহিদা, শহরতলির সংযোগ, স্থানীয় ব্যবসা এবং ডিজিটাল সেবা—সব মিলিয়ে শহরটি ভবিষ্যতের নগর ভাবনায় ভৌত অবকাঠামো ও প্রযুক্তিকে আলাদা করে না দেখার বার্তা দিচ্ছে। আর এ কারণেই তোইয়ামা মডেলেই সমাধান খুঁজছে ইওয়াতেসহ জাপানের অন্যান্য শহর। বাংলাদেশও এতে খুঁজে পেতে পারে কার্যকর নগর-পরিকল্পনার হদিস। যদিও এ ক্ষেত্রে সংকট ভিন্ন—এখানে জনসংখ্যা কমছে না, বরং শহরের ওপর চাপ বাড়ছে প্রতিদিন। তবু প্রশ্নটি একই—কীভাবে শহরকে মানুষের কাছে সহজ, সংযুক্ত ও বাসযোগ্য করা যায়? ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোর অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত এবং দ্রুত বিস্তারের বাস্তবতায় তোইয়ামার ডিজিটাল উদ্যোগের পাশাপাশি একাধিক কেন্দ্র, শক্তিশালী গণপরিবহন’ ধারণা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। এর ফলে যানজট সমস্যার সমাধান যেমন হবে, তেমনি আরও বেশি সচল ও কার্যকর নগরজীবনের দেখা পাবেন বাসিন্দারা। ভবিষ্যতের শহর বড় মানেই স্মার্ট নয়; যে শহরে গন্তব্যে পৌঁছাতে দুর্ভোগ পোহাতে হয় না, যেখানে বয়স-সামর্থ্য নির্বিশেষে সবার চাহিদাকে মূল্যায়ন করা হয়, মানুষের জীবনকে সহজ করে তুলতে প্রতিনিয়ত পদক্ষেপ নেওয়া হয়—সেই শহরই তো সত্যিকারের স্মার্ট। তোইয়ামার বার্তা তাই উপেক্ষা করা যায় না।

জাপানের তোইয়ামা যেভাবে শহরকে মানুষের কাছে আনছে