ক্ষমাশীল মানুষকে কেন ভালোবাসেন মহান আল্লাহ?
জীবনের পথে চলতে গিয়ে নানা মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়। কারও সঙ্গে গড়ে ওঠে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে তৈরি হয় গভীর আত্মিক সম্পর্ক। তবে সব সম্পর্ক সব সময় একই রকম থাকে না। কখনো ভুল-বোঝাবুঝি, কখনো মতের অমিল, আবার কখনো অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের কারণে সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়। এসব পরিস্থিতিতে রাগ, অভিমান কিংবা ক্ষোভ থেকে অনেক সময় এমন কথা বলে ফেলি, যা অন্যকে কষ্ট দেয়। আবার অন্যের কথায় বা আচরণেও আমরা আঘাত পাই। তবে এসব কষ্ট ভুলে মানুষকে ক্ষমা করে দেওয়ার মানসিকতা গড়ে তোলাই উত্তম।
ক্ষমা মানুষের অন্যতম মহৎ গুণ। এটি কেবল অন্যের অপরাধ বা ভুল উপেক্ষা করার নাম নয়, বরং নিজের ভেতরের রাগ, প্রতিহিংসা ও বিদ্বেষকে জয় করারও একটি উপায়। যে ব্যক্তি অন্যের ভুল ক্ষমা করতে জানেন, তিনি নিজের মহত্ত্বের পরিচয় দেন। একই সঙ্গে মানুষের কাছে তার সম্মান ও মর্যাদাও বৃদ্ধি পায়।
ইসলামেও ক্ষমাশীলতার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। পবিত্র হাদিসে ক্ষমা করার মাধ্যমে মানুষের মর্যাদা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সদকা করলে সম্পদের ঘাটতি হয় না। যে ব্যক্তি ক্ষমা করে, আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন। আর কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিনীত হলে তিনি তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন।’ (সহিহ মুসলিম)
ক্ষমা মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ় করে। অন্যের ভুল ক্ষমা করার মধ্য দিয়ে পারস্পরিক সম্পর্কের তিক্ততা দূর হয়। এ কারণে পবিত্র কোরআনে ক্ষমাশীল ব্যক্তিদের প্রতি আল্লাহর ভালোবাসার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর যারা মানুষকে ক্ষমা করে, আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৩)
মানুষকে ক্ষমা করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে সুন্দর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। ব্যক্তিগত জীবনে কেউ তাকে কষ্ট দিলেও তিনি প্রতিশোধ নেওয়ার পথে হাঁটেননি। বরং ধৈর্য ও উদারতার মাধ্যমে অন্যের ভুলের জবাব দিয়েছেন।
সহিহ বুখারিতে বর্ণিত একটি ঘটনা তার ক্ষমাশীলতার অনন্য উদাহরণ। আনাস (রা.) বলেন, একবার তিনি নবীজি (সা.)-এর সঙ্গে হাঁটছিলেন। তখন তার পরনে ছিল মোটা কাপড়ের তৈরি একটি ইয়েমেনি চাদর। এমন সময় এক বেদুইন এসে তার চাদর ধরে সজোরে টান দেয়। এতে কাপড়ের ঘষায় নবীজি (সা.)-এর কাঁধে দাগ পড়ে যায়। এরপর লোকটি রূঢ়ভাবে তাকে বলে, আল্লাহর দেওয়া সম্পদ থেকে তাকে কিছু দিতে। এমন আচরণেও নবীজি (সা.) রাগ করেননি। বরং লোকটির দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসেন এবং তাকে কিছু দেওয়ার নির্দেশ দেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩১৪৯)
মানুষের ভুল-ত্রুটি উপেক্ষা করে ক্ষমা করার এই শিক্ষা মহান আল্লাহ তার প্রিয় নবীকে দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আপনি ক্ষমাশীলতা অবলম্বন করুন, মানুষকে ভালো কাজের নির্দেশ দিন এবং অজ্ঞদের উপেক্ষা করুন।’ (সুরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ১৯৯)
মহানবী (সা.)-এর জীবনে ক্ষমার সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্তগুলোর একটি মক্কা বিজয়। দীর্ঘদিন ধরে যারা তাকে ও তার অনুসারীদের নির্যাতন করেছে, দেশত্যাগে বাধ্য করেছে এবং নানা ধরনের ক্ষতি করেছে, বিজয়ের পর তাদের অনেককেই তিনি ক্ষমা করে দেন। প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি উদারতা ও মহানুভবতার পরিচয় দেন।