ইন্দোনেশিয়ার আনাক ক্রাকাতাউ আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের কারণে সাময়িকভাবে ছয়টি বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। এ অবস্থায় দেশটিতে দেড় লাখের বেশি যাত্রী আটকা পড়েছেন। আজ রোববার সকালে জাকার্তার সুকার্নো-হাত্তা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি প্রথমে বন্ধ করা হয়। বিমানবন্দরটির আশপাশের আকাশসীমায় আগ্নেয়গিরির ছাই শনাক্ত হওয়ার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরিবহনমন্ত্রী দুদি পুরওয়াগান্ধি জানান, এখন পর্যন্ত ৪৬৭টি ফ্লাইট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বিমান সংস্থাগুলোকে কয়েকটি ফ্লাইট অন্য বিমানবন্দরে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন। গত শুক্রবার গভীর রাতে আগ্নেয়গিরিটিতে অগ্ন্যুৎপাত শুরু হয়। এতে একটানা ভূকম্পন, লাভার ফোয়ারা এবং আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় বিকট শব্দ শোনা যায়। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রোববার ভোরে আরও দুটি অগ্ন্যুৎপাত হয়েছে। পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কার্যক্রম স্থগিতের কারণে মূলত সিঙ্গাপুরগামী ও সিঙ্গাপুর থেকে আসা ফ্লাইট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া দোহা, সিডনি ও কুয়ালালামপুরসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক রুটের ফ্লাইটও এর আওতায় পড়েছে। পুরওয়াগান্ধি বলেন, পরীক্ষায় আগ্নেয়গিরির ছাই পশ্চিম জাভার দিকে ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণ পাওয়ার পর আরও কয়েকটি বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিমান সংস্থাগুলোকে বাতিল হওয়া ফ্লাইটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের টিকিটের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুত করার আহ্বান জানান পরিবহনমন্ত্রী। পাশাপাশি যাঁদের সামনে ভ্রমণের পরিকল্পনা রয়েছে, তাঁদের সময়মতো তথ্য দেওয়ার কথাও বলেন, যাতে বিমানবন্দরগুলোতে অতিরিক্ত ভিড় না হয়। ইন্দোনেশিয়ার আবহাওয়া, জলবায়ু ও ভূপদার্থবিষয়ক সংস্থা বিএমকেজির তথ্য অনুযায়ী, আগ্নেয়গিরিটির পূর্ব দিকে জাভা অঞ্চলে ছাই ২০ হাজার ফুট বা প্রায় ৬ হাজার মিটার পর্যন্ত পৌঁছেছে। অন্যদিকে পশ্চিম দিকে সুমাত্রার অংশে ছাইয়ের উচ্চতা ৫০ হাজার ফুট বা প্রায় ১৫ হাজার মিটার পর্যন্ত পৌঁছেছে। কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে, জাভা ও সুমাত্রা দ্বীপের মাঝখানে সুন্ডা প্রণালিতে অবস্থিত এই আগ্নেয়গিরির সাম্প্রতিক তৎপরতার সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়নি। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাসিন্দাদের ঘরের ভেতরে থাকার এবং শ্বাসতন্ত্র, চোখ ও ত্বকের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষায় মাস্ক পরার আহ্বান জানিয়েছেন। স্থানীয় সংবাদপত্র কমপাস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগ্নেয়গিরির ছাইয়ের কারণে শিক্ষার্থী ও বাসিন্দাদের চোখে জ্বালাপোড়ার অভিযোগের পর শনিবার কয়েকটি স্কুল তাদের কার্যক্রম বাতিল করে। একইভাবে চোখে জ্বালাপোড়ার অভিযোগ করে কয়েকজন জেলে সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করেছেন। আনাক ক্রাকাতাউ নামের অর্থ ‘ক্রাকাতোয়ার সন্তান’। গত শতাব্দীর শুরুতে ১৮৮৩ সালে ক্রাকাতাউ পর্বতের অগ্ন্যুৎপাতের পর সৃষ্ট আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখের অববাহিকায় সমুদ্র থেকে এই আগ্নেয়গিরির আবির্ভাব ঘটে। এরপর থেকে এটি বিক্ষিপ্তভাবে সক্রিয় রয়েছে। এই আগ্নেয়গিরির একটি অংশ ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে ধসে পড়ে। এতে বিশাল সুনামির সৃষ্টি হয়। সুমাত্রা ও জাভার কাছাকাছি উপকূলে ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন এবং আরও হাজারো মানুষ বাস্তুচ্যুত ও আহত হন। বিজ্ঞানীরা দেখতে পেয়েছিলেন, আগ্নেয়গিরিটি ধসে পড়ার সময় সেখান থেকে গড়িয়ে যাওয়া পাথরের কিছু খণ্ডের উচ্চতা ছিল প্রায় ৭০ থেকে ৯০ মিটার। প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’ বলতে প্রশান্ত মহাসাগরকে ঘিরে থাকা আগ্নেয়গিরি, ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা ও টেকটোনিক প্লেটের একটি বলয়কে বোঝায়। দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণ প্রান্ত থেকে শুরু করে নিউজিল্যান্ড পর্যন্ত প্রায় ৪০ হাজার কিলোমিটার বা ২৫ হাজার মাইলজুড়ে এটি বিস্তৃত। বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ ভূমিকম্প এই বলয়সংলগ্ন এলাকায় ঘটে। পৃথিবীর সক্রিয় আগ্নেয়গিরির প্রায় ৭৫ শতাংশই এই বলয়ে অবস্থিত। অর্থাৎ এখানে মোট ৪৫২টি সক্রিয় আগ্নেয়গিরি রয়েছে।
সহজ ও দ্রুত খবরের আপডেট পেতে আমাদের অ্যাপটি ইন্সটল করুন।