ঢাকা    বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩
দৈনিক জনপদের খবর

২০ ক্যামেরায় নজরদারি, কবুতরের ঘরে আস্তানা, তবুও ধরা ‘হ্যাকার সম্রাট’



২০ ক্যামেরায় নজরদারি, কবুতরের ঘরে আস্তানা, তবুও ধরা ‘হ্যাকার সম্রাট’

নাটোরের লালপুরে প্রযুক্তির অপব্যবহার করে গড়ে ওঠা এক অভিনব অপরাধ সাম্রাজ্যের সন্ধান মিলেছে। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে গ্রামের প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে নিজ বাড়ি পর্যন্ত অন্তত ২০টি সিসিটিভি ক্যামেরা বসিয়েছিলেন ওহিদুল মোল্লা (৩২) নামে এক তরুণ হ্যাকার।

এছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ধোঁকা দিতে তিনি ঘুমানোর জন্য বেছে নিয়েছিলেন আস্ত এক কবুতরের ঘর। তবে শত লুকোচুরি আর কৌশলী প্রস্তুতি সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত পুলিশের জালে ধরা পড়তে হয়েছে তাকে।

গত সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে লালপুর থানা পুলিশ। তার বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা করা হয়েছে।

এছাড়া ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার ও ইমো আইডি হ্যাকিং ও প্রতারক চক্রের আরও পাঁচজন সক্রিয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একইসঙ্গে প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত ৯টি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) বিকেলে আদালতের মাধ্যমে ‘ইমো সম্রাট’ ওহিদুলসহ তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

গ্রেপ্তার ওহিদুল মোল্লা জেলার লালপুর উপজেলার বিলমাড়িয়া ইউনিয়নের মোহরকয়া গ্রামের রব্বেল মোল্লার ছেলে। স্থানীয়ভাবে তাকে ইমো হ্যাকিং চক্রের ‘গুরু’ বা ‘সম্রাট’ হিসেবে সবাই চেনে ও জানেন। গ্রেপ্তার হওয়া অন্যরা হলেন– একই উপজেলার মোহরকয়া গ্রামের জহুরুল বিশ্বাসের ছেলে সাব্বির হোসেন (২৩) ও মৃত বেলাল আলির ছেলে মোতাকাব্বির আলী (২৩), বিলমাড়িয়া গ্রামের মৃত কফের আলীর ছেলে শুকুর আলী (৫০), পানসিপাড়া গ্রামের আধার প্রামাণিকের ছেলে মো. আলামিন (২৩) ও রাজশাহীর বাঘা উপজেলার আলাইপুর গ্রামের সামাদ মণ্ডলের ছেলে মুক্তার আলী (৩৪)।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিলমাড়িয়া গ্রামকে ঘিরে গড়ে ওঠা ইমো হ্যাকিং চক্রের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি ছিলেন ওহিদুল। স্থানীয়ভাবে তিনি ‘হ্যাকার সম্রাট’ হিসেবে পরিচিত এবং তার অধীনে একটি হ্যাকার চক্র সক্রিয় ছিল। ওহিদুল গ্রেপ্তার এড়াতে পরিকল্পিতভাবে নিজের বাড়িকে নিরাপত্তাবেষ্টিত করে তুলেছিলেন। গ্রামের প্রধান সড়ক থেকে নিজের বাড়ি পর্যন্ত অন্তত ২০টি সিসিটিভি ক্যামেরা বসিয়েছিলেন তিনি। পুলিশের কোনো দল প্রধান সড়ক থেকে তার বাড়ির দিকে এগোলে আগেভাগেই তা টের পেয়ে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করাই ছিল এর উদ্দেশ্য। আর লুকিয়ে থাকার জন্য কবুতরের ঘরের মধ্যেই করা হয়েছিল শোয়ার ব্যবস্থা। এমন নানা কৌশল নিয়েও শেষ পর্যন্ত পুলিশের হাত থেকে রক্ষা পাননি ওহিদুল মোল্লা।

গত সোমবার গভীর রাতে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ওহিদুলকে তার দুর্ভেদ্য আস্তানা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। অভিযানে ওহিদুলের ঘর থেকে বিভিন্ন অপারেটরের ৬৮টি সিম কার্ড উদ্ধার করা হয়। এসব সিম সাতটি মুঠোফোনে অদলবদল করে ব্যবহার করা হতো বলে জানিয়েছে পুলিশ। সিমগুলোর নম্বর সাদা কাগজে ছক করে লেখা ছিল। কোন সিমে বিকাশ, কোনটিতে নগদ সেটি বোঝাতে ব্যবহার করা হয়েছিল বিভিন্ন সাংকেতিক চিহ্ন। পুলিশ বলছে, ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের প্রতারণার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন ওহিদুল। তাকে গুরু মানতেন সহযোগীরা।

লালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম বাংলানিউজকে জানান, ওহিদুল মোল্লা দীর্ঘদিন ধরে ডিজিটাল মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছিলেন। তার অধীনে পুরো এলাকায় একটি শক্তিশালী হ্যাকার চক্র সক্রিয় রয়েছে। নির্বিঘ্নে সাইবার অপরাধ চালিয়ে যেতে ওহিদুল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও অদ্ভুত কিছু কৌশল অবলম্বন করেছিলেন।

তিনি বলেন, ওহিদুলের বাড়িটি প্রাচীরঘেরা পাকা। বাড়ির একটি কক্ষে কয়েকশ কবুতর রাখার জন্য বাসা তৈরি করা হয়েছিল। বাইরে থেকে দেখলে সেটি সাধারণ কবুতরের ঘর বলেই মনে হওয়ার কথা। কিন্তু ওই ঘরের ভেতরেই ছিল ওহিদুলের থাকার ব্যবস্থা। একটি খাটে তিনি ঘুমাতেন। পাশাপাশি ঘরটিতে ছিল দামি আসবাব, সিসিটিভি মনিটর ও শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রসহ নানা সুবিধা।

ওসি বলেন, এই ঘরে বসে ওহিদুল হ্যাকিংয়ের কাজ করতেন এবং অন্যের মুঠোফোনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করতেন। বিষয়টি জানার পর তার অনুসন্ধানে মাঠে নামে পুলিশ। একপর্যায়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এ ঘটনায় লালপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আল মাসুম বাদী হয়ে সাইবার সুরক্ষা আইনে একটি মামলা করেছেন। ওই মামলায় ওহিদুলসহ ছয়জনকে আসামি করা হয়েছে। মঙ্গলবার বিকেলে আইনি প্রক্রিয়া শেষে আসামিদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

দৈনিক জনপদের খবর

বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬


২০ ক্যামেরায় নজরদারি, কবুতরের ঘরে আস্তানা, তবুও ধরা ‘হ্যাকার সম্রাট’

প্রকাশের তারিখ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image


নাটোরের লালপুরে প্রযুক্তির অপব্যবহার করে গড়ে ওঠা এক অভিনব অপরাধ সাম্রাজ্যের সন্ধান মিলেছে। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে গ্রামের প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে নিজ বাড়ি পর্যন্ত অন্তত ২০টি সিসিটিভি ক্যামেরা বসিয়েছিলেন ওহিদুল মোল্লা (৩২) নামে এক তরুণ হ্যাকার।

এছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ধোঁকা দিতে তিনি ঘুমানোর জন্য বেছে নিয়েছিলেন আস্ত এক কবুতরের ঘর। তবে শত লুকোচুরি আর কৌশলী প্রস্তুতি সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত পুলিশের জালে ধরা পড়তে হয়েছে তাকে।

গত সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে লালপুর থানা পুলিশ। তার বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা করা হয়েছে।

এছাড়া ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার ও ইমো আইডি হ্যাকিং ও প্রতারক চক্রের আরও পাঁচজন সক্রিয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একইসঙ্গে প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত ৯টি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) বিকেলে আদালতের মাধ্যমে ‘ইমো সম্রাট’ ওহিদুলসহ তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

গ্রেপ্তার ওহিদুল মোল্লা জেলার লালপুর উপজেলার বিলমাড়িয়া ইউনিয়নের মোহরকয়া গ্রামের রব্বেল মোল্লার ছেলে। স্থানীয়ভাবে তাকে ইমো হ্যাকিং চক্রের ‘গুরু’ বা ‘সম্রাট’ হিসেবে সবাই চেনে ও জানেন। গ্রেপ্তার হওয়া অন্যরা হলেন– একই উপজেলার মোহরকয়া গ্রামের জহুরুল বিশ্বাসের ছেলে সাব্বির হোসেন (২৩) ও মৃত বেলাল আলির ছেলে মোতাকাব্বির আলী (২৩), বিলমাড়িয়া গ্রামের মৃত কফের আলীর ছেলে শুকুর আলী (৫০), পানসিপাড়া গ্রামের আধার প্রামাণিকের ছেলে মো. আলামিন (২৩) ও রাজশাহীর বাঘা উপজেলার আলাইপুর গ্রামের সামাদ মণ্ডলের ছেলে মুক্তার আলী (৩৪)।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিলমাড়িয়া গ্রামকে ঘিরে গড়ে ওঠা ইমো হ্যাকিং চক্রের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি ছিলেন ওহিদুল। স্থানীয়ভাবে তিনি ‘হ্যাকার সম্রাট’ হিসেবে পরিচিত এবং তার অধীনে একটি হ্যাকার চক্র সক্রিয় ছিল। ওহিদুল গ্রেপ্তার এড়াতে পরিকল্পিতভাবে নিজের বাড়িকে নিরাপত্তাবেষ্টিত করে তুলেছিলেন। গ্রামের প্রধান সড়ক থেকে নিজের বাড়ি পর্যন্ত অন্তত ২০টি সিসিটিভি ক্যামেরা বসিয়েছিলেন তিনি। পুলিশের কোনো দল প্রধান সড়ক থেকে তার বাড়ির দিকে এগোলে আগেভাগেই তা টের পেয়ে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করাই ছিল এর উদ্দেশ্য। আর লুকিয়ে থাকার জন্য কবুতরের ঘরের মধ্যেই করা হয়েছিল শোয়ার ব্যবস্থা। এমন নানা কৌশল নিয়েও শেষ পর্যন্ত পুলিশের হাত থেকে রক্ষা পাননি ওহিদুল মোল্লা।

গত সোমবার গভীর রাতে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ওহিদুলকে তার দুর্ভেদ্য আস্তানা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। অভিযানে ওহিদুলের ঘর থেকে বিভিন্ন অপারেটরের ৬৮টি সিম কার্ড উদ্ধার করা হয়। এসব সিম সাতটি মুঠোফোনে অদলবদল করে ব্যবহার করা হতো বলে জানিয়েছে পুলিশ। সিমগুলোর নম্বর সাদা কাগজে ছক করে লেখা ছিল। কোন সিমে বিকাশ, কোনটিতে নগদ সেটি বোঝাতে ব্যবহার করা হয়েছিল বিভিন্ন সাংকেতিক চিহ্ন। পুলিশ বলছে, ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের প্রতারণার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন ওহিদুল। তাকে গুরু মানতেন সহযোগীরা।

লালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম বাংলানিউজকে জানান, ওহিদুল মোল্লা দীর্ঘদিন ধরে ডিজিটাল মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছিলেন। তার অধীনে পুরো এলাকায় একটি শক্তিশালী হ্যাকার চক্র সক্রিয় রয়েছে। নির্বিঘ্নে সাইবার অপরাধ চালিয়ে যেতে ওহিদুল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও অদ্ভুত কিছু কৌশল অবলম্বন করেছিলেন।

তিনি বলেন, ওহিদুলের বাড়িটি প্রাচীরঘেরা পাকা। বাড়ির একটি কক্ষে কয়েকশ কবুতর রাখার জন্য বাসা তৈরি করা হয়েছিল। বাইরে থেকে দেখলে সেটি সাধারণ কবুতরের ঘর বলেই মনে হওয়ার কথা। কিন্তু ওই ঘরের ভেতরেই ছিল ওহিদুলের থাকার ব্যবস্থা। একটি খাটে তিনি ঘুমাতেন। পাশাপাশি ঘরটিতে ছিল দামি আসবাব, সিসিটিভি মনিটর ও শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রসহ নানা সুবিধা।

ওসি বলেন, এই ঘরে বসে ওহিদুল হ্যাকিংয়ের কাজ করতেন এবং অন্যের মুঠোফোনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করতেন। বিষয়টি জানার পর তার অনুসন্ধানে মাঠে নামে পুলিশ। একপর্যায়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এ ঘটনায় লালপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আল মাসুম বাদী হয়ে সাইবার সুরক্ষা আইনে একটি মামলা করেছেন। ওই মামলায় ওহিদুলসহ ছয়জনকে আসামি করা হয়েছে। মঙ্গলবার বিকেলে আইনি প্রক্রিয়া শেষে আসামিদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।


দৈনিক জনপদের খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক: লিমা ইয়াসমিন
নির্বাহী সম্পাদক : সাইফুল ইসলাম খান
বার্তা সম্পাদক : এস টি শাহিন
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক জনপদের খবর
২০ ক্যামেরায় নজরদারি, কবুতরের ঘরে আস্তানা, তবুও ধরা ‘হ্যাকার সম্রাট’
0:00 0:00
1.0x