বেশ কিছুদিন ধরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে শ্রমিক অসন্তোষ চলছে। উত্তরা থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ক্রমে মিরপুর, গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে।
প্রথমেই প্রশ্ন রাখতে চাই—১২,৫০০ টাকা থেকে সরাসরি ৩০,০০০ টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি কতটা বাস্তবসম্মত ও অর্থনৈতিকভাবে টেকসই? একজন সদ্য শিল্পে প্রবেশ করা, কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা বা দক্ষতা নেই এমন শ্রমিকের প্রারম্ভিক বেতন কেমন হওয়া উচিত? বাংলাদেশের বাস্তবতায় অসংখ্য স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী তরুণ-তরুণী বেকারত্বের সঙ্গে লড়াই করছেন। তাই মজুরি নির্ধারণে আবেগ নয়, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং শিল্পের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনা করা জরুরি।
আমি তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে পোশাক শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা অর্জনের পর নিজেই উদ্যোক্তা হয়েছি। আমার প্রতিষ্ঠান শুধু নিজের বা পরিবারের জীবিকা নির্বাহের জন্য গড়ে তুলিনি; কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখাই আমার উদ্যোক্তা জীবনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। অনেক প্রতিকূলতা ও সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার অভিজ্ঞতা থেকেই আজকের কথাগুলো বলছি।
আমি শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, অধিকার ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশের পক্ষে। তবে সেই দাবি আদায়ের প্রক্রিয়ায় শিল্পের অস্তিত্ব, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়।
শ্রমিকদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার বন্ধ হওয়া জরুরি
২০০৬ সাল থেকে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়—বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক প্রয়োজন কিংবা কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে পোশাক শিল্পের বিপুল শ্রমিক জনগোষ্ঠীর আবেগ, সরলতা ও অসহায়ত্বকে ব্যবহার করার প্রবণতা দেখা গেছে। বাংলাদেশে অন্যান্য শিল্প খাতেও বিপুলসংখ্যক শ্রমিক রয়েছেন। কিন্তু বারবার কেন পোশাক শিল্পের শ্রমিকরাই এ ধরনের আন্দোলন ও অস্থিরতার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন? কেন এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা দেখা যায়?
এর পেছনে দেশীয় কিংবা বিদেশি কোনো স্বার্থান্বেষী মহলের ভূমিকা রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবে এর পরিণতি বারবার বহন করতে হয় পোশাক শিল্পকে। কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় উদ্যোক্তাদের, ক্ষতিগ্রস্ত হন শ্রমিক ও তাঁদের পরিবার এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রশ্নবিদ্ধ হয় বাংলাদেশের ভাবমূর্তি।
একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকে এভাবে বারবার রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীগত স্বার্থের লক্ষ্যবস্তু হতে দেওয়া যায় না। শ্রমিকদের ন্যায্য আন্দোলনকে সম্মান করতে হবে, কিন্তু সেই আন্দোলন যেন কোনো স্বার্থান্বেষী মহলের হাতিয়ারে পরিণত না হয়, তা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট সকলের দায়িত্ব। এই প্রবণতা বন্ধ হওয়া জরুরি।
সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর দায়বদ্ধতা
এই সংকটের জন্য শুধু শ্রমিক বা মালিকপক্ষকে দায়ী করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এখানে সরকারের পাশাপাশি BGMEA, BKMEA, মালিক সংগঠন এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোরও গুরুত্বপূর্ণ দায়বদ্ধতা রয়েছে।
আমার বিশ্বাস, উত্তরা থেকে যখন প্রথম এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়, তখনই সরকার উদ্যোগ নিয়ে শ্রমিক প্রতিনিধি ও মালিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দকে নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসলে এবং একটি কার্যকর সমাধানের পথে এগোলে পরিস্থিতি হয়তো আজকের পর্যায়ে পৌঁছাত না। প্রাথমিক পর্যায়ে যথাযথ উদ্যোগ ও সমন্বয়ের অভাব যে সংকটকে আরও বিস্তৃত করেছে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের আত্মসমালোচনা প্রয়োজন।
বর্তমানে সরকারকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে এবং জরুরি ভিত্তিতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোকেও আরও দৃঢ়, দায়িত্বশীল ও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। সব পক্ষকে নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে শ্রমিকদের ন্যায্য ও যৌক্তিক দাবির একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান দ্রুত নিশ্চিত করতে হবে।
শিল্পের সংকট মানেই জাতীয় অর্থনীতির সংকট
আমাদের পোশাক শিল্প এমনিতেই বহুমুখী প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কাঁচামাল আমদানিনির্ভরতা, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অনিশ্চয়তা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, বন্দরের জটিলতা, ব্যাংকিং ও অর্থায়ন সমস্যা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে ব্যবসা পরিচালনা করতে হচ্ছে। এর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী শ্রমিক অসন্তোষ, ভাঙচুর ও উৎপাদন ব্যাহত হওয়া শিল্পের জন্য নতুন বিপর্যয় তৈরি করছে।
গত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তৈরি পোশাক শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে গড়ে উঠেছে। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে টেক্সটাইলসহ অসংখ্য ব্যাকওয়ার্ড ও ফরোয়ার্ড লিংকেজ শিল্প। লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎস এই খাত।
একসময় পাটশিল্প যে অবস্থান হারিয়েছে, আমাদের পোশাক শিল্পও যদি অস্থিতিশীলতা ও অনিশ্চয়তার কারণে একই পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়, তাহলে তার প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা চলতে থাকলে অনেক উদ্যোক্তা হয়তো এই ব্যবসা থেকে সরে দাঁড়াবেন, বিদেশি ক্রেতারা বিকল্প দেশের দিকে ঝুঁকবেন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একবার ক্রেতাদের আস্থা হারালে তা পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন।
এখনই প্রয়োজন কার্যকর ও সমন্বিত সিদ্ধান্ত
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে অবিলম্বে আলোচনায় বসতে হবে। শ্রমিকদের ন্যায্য ও যৌক্তিক দাবি পূরণের পাশাপাশি শিল্পের সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান বিবেচনায় একটি বাস্তবসম্মত মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে।
একই সঙ্গে শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করে তাঁদের কাজে ফিরিয়ে আনতে হবে, প্রতিটি কারখানায় স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রম চালু করতে হবে এবং বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতিশ্রুত সময় অনুযায়ী রপ্তানি ও শিপমেন্ট নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি এবং ক্রেতাদের আস্থা রক্ষায় আর সময়ক্ষেপণের সুযোগ নেই।
আমার বক্তব্য অত্যন্ত স্পষ্ট—শ্রমিক ও মালিক একে অপরের প্রতিপক্ষ নন; তাঁরা একই শিল্পের দুটি অপরিহার্য অংশ। শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে, উদ্যোক্তার টিকে থাকার পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে। সংঘাত নয়, প্রয়োজন সংলাপ, সমন্বয় ও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত।
এখন আর সময়ক্ষেপণের সুযোগ নেই। দেশের স্বার্থে, শ্রমিকের স্বার্থে এবং জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থে সরকার, মালিক সংগঠন, শ্রমিক সংগঠন এবং প্রত্যেক নাগরিককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল হতে হবে।
কারণ পোশাক শিল্প শুধু একটি ব্যবসা নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
পোশাক শিল্প বাঁচলে কর্মসংস্থান বাঁচবে, অর্থনীতি বাঁচবে, বাংলাদেশ বাঁচবে।
লেখক : ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এনডব্লিউ আরএমজি লিমিটেড
মতামত