ইউক্রেনের বিভিন্ন এলাকায় রুশ বাহিনী হামলা চালিয়েছে। এতে অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা। এরই মধ্যে ইউক্রেন দাবি করেছে, রাশিয়ার অভ্যন্তরে আর্কটিক অঞ্চলে একটি প্রাকৃতিক গ্যাস কারখানায় ড্রোন হামলা চালিয়েছে তারা। ওই হামলার পর কারখানাটিতে আগুন ধরে যায়।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, স্থানীয় সময় আজ বৃহস্পতিবার ভোরে দক্ষিণ ইউক্রেনের মাইকোলাইভে রুশ হামলায় চারজন নিহত হন। একই সময়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর সুমিতে একটি শপিং সেন্টারে ড্রোন হামলায় নিহত হন আরও তিনজন।
মাইকোলাইভের ভারপ্রাপ্ত গভর্নর হেওরহি রেশেতিলভ বলেন, সেখানে রুশ হামলায় বেসামরিক ও শিল্প অবকাঠামো—দুই ধরনের স্থাপনাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিহত চারজনের মধ্যে দুইজন পুরুষ ও দুইজন নারী। তিনি টেলিগ্রামে জানান, হামলায় অন্তত আরও ১৯ জন আহত হয়েছেন। সুমিতে হামলায় অন্তত ১৪ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন সুমি আঞ্চলিক সামরিক প্রশাসনের প্রধান ওলেহ হ্রিহোরভ। টেলিগ্রামে তিনি বলেন, আহতদের মধ্যে তিনজন শিশু রয়েছে।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় মাইকোলাইভে হামলার কথা নিশ্চিত করেছে। তবে তাদের দাবি, হামলার লক্ষ্য ছিল একটি ড্রোনের গুদাম। মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, তারা কৃষ্ণসাগরের ওদেসার কাছে ইউক্রেনের বন্দরনগরী চর্নোমোরস্ক এবং দুটি জাহাজেও হামলা চালিয়েছে। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, এসব স্থাপনা ও লক্ষ্যবস্তু সামরিক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছিল।
ইউক্রেনে এসব হামলার আগে রুশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, ইউক্রেনীয় বাহিনী রাশিয়ার ইয়ামাল-নেনেতস অঞ্চলে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। অঞ্চলটি ইউক্রেনের সীমান্ত থেকে প্রায় ২ হাজার ৮০০ কিলোমিটার বা ১ হাজার ৭০০ মাইল দূরে। ওই অঞ্চলের গভর্নর দিমিত্রি আর্তিউখভ জানান, হামলার লক্ষ্য ছিল নোভি উরেংগয়ের একটি শিল্প স্থাপনা। তিনি টেলিগ্রামে বলেন, হামলাটি প্রতিহত করা হয়েছে। তবে ড্রোনের পড়ে যাওয়া ধ্বংসাবশেষের কারণে সেখানে আগুন ধরে যায়। তিনি আরও বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো মৃত্যু বা আহতের ঘটনা ঘটেনি। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ও ধরন নির্ধারণ করা হচ্ছে।’
ইউরাল অঞ্চলে ক্রেমলিনের প্রতিনিধি আর্তেম ঝোগা জানান, গত বুধবারের এই হামলাই ওই অঞ্চলের আর্কটিক অংশে প্রথম কোনো হামলার ঘটনা। ইউক্রেনের স্পেশাল অপারেশনস ফোর্সেস (এসওএফ) একাধিক পোস্টে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে হামলাটির দায় স্বীকার করেছে। এসওএফ বলেছে, ‘প্রথমবারের মতো! যুদ্ধের সবচেয়ে গভীর হামলা—ইউক্রেনীয় এসওএফ ৩ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দূরে রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ কারখানাগুলোতে হামলা চালিয়েছে।’
সংস্থাটি আরও বলেছে, পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ার অভ্যন্তরে এটি ইউক্রেনের স্পেশাল অপারেশনস ফোর্সেসের সবচেয়ে গভীর হামলা। ইউক্রেনীয় বাহিনী তাদের পোস্টে দাবি করেছে, তারা নোভি উরেংগয় ও পুরোভস্কি—এই দুটি গ্যাস কারখানায় ‘সফলভাবে হামলা’ চালিয়েছে। তারা আরও বলেছে, ‘আজ পর্যন্ত এই এলাকাকে আগ্রাসনকারী রাশিয়ার নিরাপদ পশ্চাৎভূমি হিসেবে বিবেচনা করা হতো।’
ইউক্রেনীয় বাহিনীর দাবি, এসব স্থাপনা রাশিয়ার গ্যাস শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইয়ামাল অঞ্চলের বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া বিপুল পরিমাণ কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে এসব কারখানা। প্রতি বছর সেখানে লাখ লাখ টন কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করা হয়।
এর আগে, ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ শুরুর পর দুই দেশের সম্পর্ক ভেঙে পড়ার আগ পর্যন্ত গ্যাজপ্রম ইয়ামাল অঞ্চল থেকে পশ্চিম ইউরোপ পর্যন্ত গ্যাস রপ্তানি করত। ২০২০ সালের হিসাব অনুযায়ী, ওই অঞ্চলে ২৬ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাসের মজুত রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এই পরিমাণ গ্যাস দিয়ে বিশ্বের বর্তমান চাহিদা ছয় বছরেরও বেশি সময় মেটানো সম্ভব। রাশিয়ার প্রতিদিনের ইউক্রেনীয় শহর ও জনপদে বোমাবর্ষণের পাল্টা জবাব হিসেবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইউক্রেন রাশিয়ার অভ্যন্তরে দূরপাল্লার হামলা আরও জোরদার করেছে।
চলতি মাসের শুরুতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছিলেন, যুদ্ধ চলাকালে তাঁর দেশের ড্রোন রাশিয়ার আকাশসীমাকে ‘পুরোপুরি অনিরাপদ’ করে তুলবে।
মতামত