প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, ‘শক্ত সমালোচনা গণতন্ত্রের প্রাণ। সমালোচনা কঠোর ভাষায় হতে পারে, কিন্তু তা যেন অশ্লীল না হয়। অশ্লীল শব্দ প্রয়োগ করে ব্যক্তিগতভাবে গালিগালাজ করা আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ।’
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘সাম্প্রতিক গ্যাস ও বিদ্যুতের সঙ্কট : সরকার ও জনগণের করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে একথা বলেন তিনি। সেমিনারের আয়োজন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা।
রিজভী বলেন, ‘স্বাধীনতার পর থেকে কিংবা স্বাধীনতার আগে থেকে আমাদের পূর্বপুরুষরা ও অগ্রজরা সংগ্রাম করেছেন এবং শরীর থেকে রক্ত ঝরিয়েছেন। সেই রক্ত ঝরানোর ধারাবাহিকতায় এবং বারবার তাদের রেখে যাওয়া অর্জন থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই তো এই জুলাই বিপ্লব হলো। আমরা একটি সত্যিকার অর্থেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, যেখানে বিরোধী দল দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে এবং সরকারও দায়িত্বশীল হবে।’
তিনি বলেন, ‘অবশ্যই বিরোধী দলের অধিকার আছে সরকারের সমালোচনা করার; প্রতিটি কাজের সমালোচনা করার অধিকার তাদের রয়েছে। আর এই সমালোচনা করলেই সরকার তার ভুল-ভ্রান্তিগুলো বুঝতে পারবে, টের পাবে এবং সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে। এটাই একটি ডেমোক্রেটিক সরকার বা ডেমোক্রেটিক সোসাইটির বৈশিষ্ট্য।’
‘আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী নয় বলেই আমাদের গণতন্ত্র বারবার আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে এবং দুমড়ে-মুচড়ে পড়ে গেছে। আমাদের যে প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন, তার মধ্যে রয়েছে উচ্চতর আদালত ও গণমাধ্যম—এগুলো এক একটি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী থাকলে কখনো গণতন্ত্রকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে ফ্যাসিবাদ বা একনায়কতন্ত্র কায়েম করা যায় না। প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়; তারা স্বাভাবিকভাবে ও স্বাধীনভাবে গড়ে উঠবে এবং নিজেদের দায়িত্ব পালন করবে,’ বলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব।
রিজভী বলেন, ‘ফ্যাসিস্টরা প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে দেয় না। তারা গণমাধ্যমের মালিকদের কিনে নেয়ার চেষ্টা করে অথবা যাদের লাইসেন্স দেয়া হয়, তাদের মধ্যে দলের লোক বা আত্মীয়স্বজনকে খুঁজে বের করে দেয়া হয়। ফ্যাসিবাদের যে বক্তব্য এবং ফ্যাসিবাদের দুঃশাসনকে জায়েজ ও বৈধ করার জন্য তারা এই কাজটি করে। এর বিরুদ্ধেই তো লড়াই, এর বিরুদ্ধেই তো এই রক্তঝরানো আন্দোলন! যেখানে শিশু, প্রাইভেট স্কুলের ছাত্র, কলেজের ছাত্র, ইউনিভার্সিটির ছাত্র এবং সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ জীবন দিয়েছে।’
জ্বালানি সঙ্কট বিষয়ে রিজভী বলেন, ‘জ্বালানি সঙ্কট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাহেবের নিজের তৈরি করা সঙ্কট নয়; এটি গ্লোবাল বা বৈশ্বিক যুদ্ধজনিত সঙ্কট। পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালী—যার নিয়ন্ত্রণ এবং ইরানকে পর্যুদস্ত করার জন্য আমেরিকা, ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ চলছে। আর সমস্ত তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো মধ্যপ্রাচ্যের ওই জায়গাতেই অবস্থিত। হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১৪০ থেকে ১৪৫টি জাহাজ যাতায়াত করে। আমরা যে তরল এলএনজি গ্যাস নিয়ে আসি, তার অধিকাংশ জাহাজ ও কার্গো সেই পথ দিয়েই আসে।’
‘যুদ্ধ চলায় এবং সমুদ্রে মাইন পুঁতে রাখার ভয়ে এখন সেই যাতায়াত বাধাগ্রস্ত হচ্ছে; এমনকি কার্গো জাহাজের মধ্যেও গুম হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। এই অবস্থায় একটি দেশ, যাকে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়, সে কীভাবে ন্যাশনাল গ্রিডে গ্যাস দিয়ে বাসাবাড়ির রান্নার চুলা জ্বালাবে, কলকারখানা চালু রাখবে কিংবা অন্যান্য বিচার নিশ্চিত করবে? এটি তাকে বাধ্য করছে,’ বলেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘সরকার যদি অতীতের ব্যর্থতাগুলোর কথা বলেই চুপ করে বসে থাকতো, তাহলেও তো হতো। সরকার কিন্তু চুপ করে বসে নেই। তারা অতিরিক্ত বাজেটের বাইরে ৪০ হাজার কোটি টাকা এই খাতে বরাদ্দ করেছে, যাতে খুব দ্রুততম সময়ে আমরা গ্যাস নিয়ে আসতে পারি। নিকটবর্তী দেশগুলো, যেমন—মিয়ানমার, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এই প্রতিবেদনের মধ্যেই উল্লেখ আছে যে, গ্যাসের যে টার্মিনাল, তাতে ত্রুটি দেখা দিয়েছে এবং তা মেরামত করার জন্য সময় লাগছে। একদিকে গ্লোবাল ওয়ার, অন্যদিকে আমাদের গ্যাসের টার্মিনালের ত্রুটি ও তার মেরামত—এই দুই কারণেই আজকের এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।’
রিজভী বলেন, ‘সবাই মিলে যদি এই দেশটাকে পুনর্নির্মাণ করতে পারি, আমাদের গণতন্ত্রকে যদি শক্তিশালী করতে চাই, তবে সব পরিহার করে প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। তবেই প্রতিটি মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং আমরা যে কাজগুলো করতে চাই, তা করতে সক্ষম হব।’
মতামত