ঢাকা    বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯ ভাদ্র ১৪৩৩
দৈনিক জনপদের খবর

মধ্যপ্রাচ্যের তেল খাতে আঘাত, বিলিয়ন ডলারের ঝুঁকিতে মার্কিন বিনিয়োগ


প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড

মধ্যপ্রাচ্যের তেল খাতে আঘাত, বিলিয়ন ডলারের ঝুঁকিতে মার্কিন বিনিয়োগ

ইরান যুদ্ধের প্রভাব পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি খাতের ওপর গভীরভাবে পড়তে শুরু করেছে। সংঘাতের ছায়ায় বৈশ্বিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম একলাফে অনেকটা বেড়ে গেছে। 

এর ফলে বড় মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো কম তেল বিক্রি করেও চড়া দামে বিশ্বজুড়ে পেট্রোলিয়াম সরবরাহ করে সাময়িকভাবে চড়া মুনাফা পকেটে পুরছে। কিন্তু একই সঙ্গে, মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস অবকাঠামোর ওপর অব্যাহত হামলায় এই অঞ্চলে তাদের দীর্ঘমেয়াদী বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ ও চড়া তেলের বাজার

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগে যেখানে প্রতি ব্যারেল তেল ৭২ ডলারে বিক্রি হতো, তা এখন বেড়ে প্রায় ৮৮ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ যে পথ দিয়ে পরিবহন করা হতো, সেই বিখ্যাত হরমুজ প্রণালি সামরিক অস্থিরতার কারণে বাণিজ্যিকভাবে প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। 

সম্প্রতি ইরান ও ওমানের মধ্যে সাময়িক চলাচলের কিছু সমঝোতা হলেও, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা নেই। ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির শর্ত পুরোপুরি না মানা পর্যন্ত এই পথ স্বাভাবিক করা হবে না। ফলে বাজারে জ্বালানির দাম চড়া থাকছে, যা তেল কোম্পানিগুলোর তাতক্ষণিক আয় বাড়ালেও দীর্ঘমেয়াদে পুরো খাতের স্বাভাবিক বৃদ্ধিকে থমকে দিচ্ছে।

সব মার্কিন তেল কোম্পানির ঝুঁকি ও লাভের হিসাব কিন্তু এক রকম নয়। শেভরনের মতো প্রতিষ্ঠানের মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কম হওয়ায় তারা এই সময়ে রেকর্ড পরিমাণ মুনাফা করতে পেরেছে। কিন্তু এক্সনমোবিল ও কনোকোফিলিপসের মতো বড় জায়ান্টরা তীব্র বিপাকে পড়েছে। 

কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে এসব মার্কিন কোম্পানির শত শত কোটি ডলারের বড় বড় যৌথ প্রকল্প রয়েছে। পারস্য উপসাগর থেকে মার্কিন শক্তি কোম্পানিগুলোর নিজস্ব গ্যাস উত্তোলন প্রায় ৪০ শতাংশ এবং তেল উত্তোলন এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কায় পড়েছে। তেলের উচ্চমূল্য এই ক্ষতি কিছুটা ঢেকে দিলেও প্রকল্প বাস্তবায়নে যে বিলম্ব ও ক্ষতি হচ্ছে, তা কোম্পানিগুলোর আগামী দিনের বড় উদ্বেগের কারণ।

জ্বালানি অবকাঠামোয় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত

যুদ্ধের তাণ্ডবে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সামরিক স্থাপনার চেয়ে সাধারণ নাগরিক ও জ্বালানি অবকাঠামো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, বাহরাইন ও সৌদি আরবের বিভিন্ন শোধনাগার, বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং গ্যাস কমপ্লেক্সে একের পর এক হামলা চালানো হয়েছে। 

বিশ্বখ্যাত কাতার-এনার্জির সাথে যৌথভাবে পরিচালিত এক্সনমোবিলের গুরুত্বপূর্ণ এলএনজি কেন্দ্রগুলো হামলার শিকার হওয়ায় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হয়েছিল। এসব স্থাপনা সারিয়ে তুলতে বহু বছর সময় লেগে যাবে এবং বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত খরচ করতে হবে।

মার্কিন শক্তি খাতের জন্য অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে সৌদি আরামকো বা আদনকের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রাধান্য থাকলেও, মার্কিন কোম্পানি প্রযুক্তি ও পরিচালনার দিক দিয়ে সেখানে বিশাল শক্ত ঘাটি বানিয়েছিল। এমনকি তেলের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রধান মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়ও এখন মধ্যপ্রাচ্যের সহিংসতায় আটকে পড়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্বার্থে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখার বিষয়ে কড়া বার্তা দিলেও মাঠে পরিস্থিতি ভিন্ন। বিশ্ব জ্বালানি বাজারে পণ্যটির মূল্য সাময়িক স্বস্তি দিলেও, পারস্য উপসাগরের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মার্কিন শক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এক বিশাল আর্থিক রূপ নিয়েছে।

সূত্র: আল-জাজিরা।

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

দৈনিক জনপদের খবর

বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬


মধ্যপ্রাচ্যের তেল খাতে আঘাত, বিলিয়ন ডলারের ঝুঁকিতে মার্কিন বিনিয়োগ

প্রকাশের তারিখ : ৩০ আগস্ট ২০২৬

featured Image

ইরান যুদ্ধের প্রভাব পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি খাতের ওপর গভীরভাবে পড়তে শুরু করেছে। সংঘাতের ছায়ায় বৈশ্বিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম একলাফে অনেকটা বেড়ে গেছে। 

এর ফলে বড় মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো কম তেল বিক্রি করেও চড়া দামে বিশ্বজুড়ে পেট্রোলিয়াম সরবরাহ করে সাময়িকভাবে চড়া মুনাফা পকেটে পুরছে। কিন্তু একই সঙ্গে, মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস অবকাঠামোর ওপর অব্যাহত হামলায় এই অঞ্চলে তাদের দীর্ঘমেয়াদী বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ ও চড়া তেলের বাজার

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগে যেখানে প্রতি ব্যারেল তেল ৭২ ডলারে বিক্রি হতো, তা এখন বেড়ে প্রায় ৮৮ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ যে পথ দিয়ে পরিবহন করা হতো, সেই বিখ্যাত হরমুজ প্রণালি সামরিক অস্থিরতার কারণে বাণিজ্যিকভাবে প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। 

সম্প্রতি ইরান ও ওমানের মধ্যে সাময়িক চলাচলের কিছু সমঝোতা হলেও, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা নেই। ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির শর্ত পুরোপুরি না মানা পর্যন্ত এই পথ স্বাভাবিক করা হবে না। ফলে বাজারে জ্বালানির দাম চড়া থাকছে, যা তেল কোম্পানিগুলোর তাতক্ষণিক আয় বাড়ালেও দীর্ঘমেয়াদে পুরো খাতের স্বাভাবিক বৃদ্ধিকে থমকে দিচ্ছে।

সব মার্কিন তেল কোম্পানির ঝুঁকি ও লাভের হিসাব কিন্তু এক রকম নয়। শেভরনের মতো প্রতিষ্ঠানের মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কম হওয়ায় তারা এই সময়ে রেকর্ড পরিমাণ মুনাফা করতে পেরেছে। কিন্তু এক্সনমোবিল ও কনোকোফিলিপসের মতো বড় জায়ান্টরা তীব্র বিপাকে পড়েছে। 

কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে এসব মার্কিন কোম্পানির শত শত কোটি ডলারের বড় বড় যৌথ প্রকল্প রয়েছে। পারস্য উপসাগর থেকে মার্কিন শক্তি কোম্পানিগুলোর নিজস্ব গ্যাস উত্তোলন প্রায় ৪০ শতাংশ এবং তেল উত্তোলন এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কায় পড়েছে। তেলের উচ্চমূল্য এই ক্ষতি কিছুটা ঢেকে দিলেও প্রকল্প বাস্তবায়নে যে বিলম্ব ও ক্ষতি হচ্ছে, তা কোম্পানিগুলোর আগামী দিনের বড় উদ্বেগের কারণ।

জ্বালানি অবকাঠামোয় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত

যুদ্ধের তাণ্ডবে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সামরিক স্থাপনার চেয়ে সাধারণ নাগরিক ও জ্বালানি অবকাঠামো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, বাহরাইন ও সৌদি আরবের বিভিন্ন শোধনাগার, বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং গ্যাস কমপ্লেক্সে একের পর এক হামলা চালানো হয়েছে। 

বিশ্বখ্যাত কাতার-এনার্জির সাথে যৌথভাবে পরিচালিত এক্সনমোবিলের গুরুত্বপূর্ণ এলএনজি কেন্দ্রগুলো হামলার শিকার হওয়ায় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হয়েছিল। এসব স্থাপনা সারিয়ে তুলতে বহু বছর সময় লেগে যাবে এবং বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত খরচ করতে হবে।

মার্কিন শক্তি খাতের জন্য অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে সৌদি আরামকো বা আদনকের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রাধান্য থাকলেও, মার্কিন কোম্পানি প্রযুক্তি ও পরিচালনার দিক দিয়ে সেখানে বিশাল শক্ত ঘাটি বানিয়েছিল। এমনকি তেলের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রধান মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়ও এখন মধ্যপ্রাচ্যের সহিংসতায় আটকে পড়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্বার্থে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখার বিষয়ে কড়া বার্তা দিলেও মাঠে পরিস্থিতি ভিন্ন। বিশ্ব জ্বালানি বাজারে পণ্যটির মূল্য সাময়িক স্বস্তি দিলেও, পারস্য উপসাগরের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মার্কিন শক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এক বিশাল আর্থিক রূপ নিয়েছে।

সূত্র: আল-জাজিরা।


দৈনিক জনপদের খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক: লিমা ইয়াসমিন
নির্বাহী সম্পাদক : সাইফুল ইসলাম খান
বার্তা সম্পাদক : এস টি শাহিন
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক জনপদের খবর
মধ্যপ্রাচ্যের তেল খাতে আঘাত, বিলিয়ন ডলারের ঝুঁকিতে মার্কিন বিনিয়োগ
0:00 0:00
1.0x