স্কুল থেকে ফিরে সোজা সোফায় শুয়ে পড়া, পড়ালেখায় মনোযোগ দিতে না পারা কিংবা ছুটির দিনে বেলা পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকা—শিশুদের মধ্যে এমন পরিবর্তন প্রায়ই দেখা যায়।
অনেক সময় বয়সের বৃদ্ধি, পড়াশোনার চাপ বা অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমের কারণে সাময়িক ক্লান্তি আসা স্বাভাবিক। তবে এই ক্লান্তি যদি সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে চলতে থাকে, তবে তা সাধারণ কোনো অলসতা না-ও হতে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী অবসাদ শিশুর মানসিক বিকাশ, মেজাজ, পড়াশোনা এবং প্রতিদিনের আনন্দদায়ক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
চিকিৎসকদের মতে, সাময়িক অলসতা ও দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক ক্লান্তির পার্থক্য বোঝা অভিভাবকদের জন্য অত্যন্ত জরুরি। শিশুরা যখন প্রতিনিয়ত ক্লান্ত থাকে, তখন এর পেছনে বেশ কিছু শারীরিক ও মানসিক কারণ থাকতে পারে।
অপর্যাপ্ত বা নিম্নমানের ঘুম
অনেক শিশু ৯ থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুমালেও সকালে ওঠার পর ক্লান্ত বোধ করে। রাতে বারবার ঘুম ভাঙা, ছটফট করা, নাক ডাকা কিংবা মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার কারণে গভীর ঘুম ব্যাহত হয়। ফলে পর্যাপ্ত সময় ঘুমানোর পরেও শরীর পুরোপুরি চাঙ্গা হতে পারে না।
শরীরে আয়রনের ঘাটতি
শিশুদের ক্ষেত্রে কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়া ক্লান্তির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে আয়রনের অভাব। রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়া পুরোপুরি হওয়ার আগেই আয়রনের মৃদু ঘাটতির কারণে শরীরে অক্সিজেন সরবরাহ কমে যায়। এর ফলে শিশু ক্লান্ত ও খিটখিটে হয়ে পড়ে। বিশেষ করে বয়ঃসন্ধিকালের কিশোরী এবং বাছাই করে খাওয়া শিশুদের মধ্যে এই ঝুঁকি বেশি দেখা যায়।
নিদ্রাহীনতা ও শ্বাসনালীর সমস্যা
রাতে শিশুদের জোরে নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে দম আটকে আসা বা শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া স্লিপ অ্যাপনিয়ার লক্ষণ হতে পারে। এটি শিশুর মস্তিষ্কের সুগভীর ঘুম ভেঙে দেয়। চিকিৎসকদের মতে, এই সমস্যার কারণে শিশুরা ক্লান্তি প্রকাশের বদলে অনেক সময় অতিরিক্ত চঞ্চলতা বা মনোযোগের অভাব দেখায়, যা অনেকে ভুলবশত আচরণের সমস্যা মনে করেন। আরও পড়ুনআরও পড়ুনকোমর ও পেটের অতিরিক্ত মেদ হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়: নতুন গবেষণা
ঘুমানোর আগে স্ক্রিনের আলো
মোবাইল, ট্যাবলেট বা টিভির নীল আলো শরীর থেকে ‘মেলাটোনিন’ নামক ঘুমের হরমোন নিঃসরণে বাধা দেয়। ঘুমানোর ঠিক আগপর্যন্ত স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে শিশুরা দেরিতে ঘুমাতে যায়, যা ধীরে ধীরে তাদের দীর্ঘমেয়াদী ঘুমের ঘাটতির দিকে ঠেলে দেয়।
থাইরয়েডের সমস্যা
শিশুদের মধ্যে থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি সহজে বোঝা যায় না। তবে ক্লান্তির পাশাপাশি যদি শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি থেমে যায়, ওজন হঠাৎ বেড়ে যায়, কোষ্ঠকাঠিন্য বা শুষ্ক ত্বকের সমস্যা দেখা দেয়, তবে রক্তের থাইরয়েড পরীক্ষা করানো প্রয়োজন।
মানসিক চাপ ও উদ্বেগ
সব সময় শারীরিক অসুস্থতার কারণে ক্লান্তি আসে না। শিশুরা মানসিক চাপ বা দুশ্চিন্তা সরাসরি প্রকাশ করতে পারে না। ফলে মানসিক চাপ শারীরিক ক্লান্তি হিসেবে প্রকাশ পায়। যদি কম শক্তির পাশাপাশি শিশুর মেজাজে হঠাৎ পরিবর্তন আসে বা প্রিয় কাজগুলোর প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, তবে তার মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে খেয়াল দেওয়া প্রয়োজন।
অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস ও বেশি চিনিযুক্ত খাবার
সকালের নাশতা না খাওয়া, অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার এবং অনিয়মিত সময়ে খাওয়ার কারণে রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়ে এবং কমে। সঠিক পুষ্টি, প্রোটিন এবং পর্যাপ্ত পানির অভাবে বিকালের দিকে শিশুদের শক্তি দ্রুত ফুরিয়ে যায়।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
শিশুর ক্লান্তি বা অলসতা যদি ২ থেকে ৩ সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয়, তবে বিষয়টি হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে ক্লান্তির সঙ্গে যদি ত্বক ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া, হঠাৎ ওজন পরিবর্তন বা মেজাজের তীব্র পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়, তবে দ্রুত শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। একটি সাধারণ রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমেই অধিকাংশ সমস্যার কারণ শনাক্ত ও সহজে চিকিৎসা করা সম্ভব।
সূত্র: এনডিটিভি লাইফলাইন
মতামত