ইয়েমেনের রাজধানী সানায় বিদ্রোহীদের মূল ঘাঁটিতে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোটের ভয়াবহ বিমান হামলার জবাবে রিয়াদসহ বিভিন্ন স্থান লক্ষ্য করে ফের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা। বিশ্ববাজারের অন্যতম শীর্ষ অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক দেশটি এবং ইয়েমেনি গোষ্ঠীটির মধ্যে এই নতুন করে সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করেছে।
সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রাজধানী রিয়াদকে লক্ষ্য করে ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র তারা মাঝআকাশেই ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে।
বুধবার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের প্রাণকেন্দ্রে বিকট বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো শহর। এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই ওই এলাকায় অবস্থিত দেশটির রাষ্ট্রীয় জ্বালানি জায়ান্ট আরামকোর কার্যক্রম পরিচালন কেন্দ্রে আঘাত হানে হুতিদের একটি ক্ষেপণাস্ত্র। সাধারণত সৌদি আরবের সীমান্ত কিংবা রাজধানীর উপকণ্ঠের অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হলেও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তা রিয়াদের কেন্দ্রস্থলের অনেকটাই কাছাকাছি চলে এসেছে। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার রাতে সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের সাদা রেখা আকাশে ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায় এবং এর পরপরই বিকট বিস্ফোরণের শব্দ হয়। রিয়াদের একটি প্রধান সড়কে হেঁটে যাওয়া এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, তিনি একটি শপিং মল বা শপিং সেন্টারের ওপর দিয়ে আলোকচ্ছটা ও ধোঁয়ার কুণ্ডলী রেখে একটি ক্ষেপণাস্ত্রকে ছুটে যেতে দেখেছেন, যার পরপরই বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। এ সময় আতঙ্কিত সাধারণ মানুষকে রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে থমথমে পরিস্থিতিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখা গেছে।
বুধবারও রিয়াদে পুনরায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় এবং সাধারণ মানুষের মোবাইল ফোনে ‘আকাশপথের হুমকি’ সংক্রান্ত জরুরি সতর্কতা বার্তা পাঠিয়ে নিরাপদে আশ্রয় নিতে বলা হয়। যদিও এর কয়েক মিনিট পরই সেই সতর্কতা তুলে নেওয়া হয়। সৌদি প্রতিরক্ষা সংস্থা জানিয়েছে, রিয়াদে দুটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার পর তার খণ্ডবিণ্ড অংশ নিচে পড়ে দুই নারী, এক পুরুষ ও এক শিশুসহ মোট চারজন আহত হয়েছেন এবং প্রায় ১৫টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, মঙ্গলবার জাহরানে আরামকোর সদর দপ্তর কমপ্লেক্সের একটি ভবনে হামলা হলে সেখানে সামান্য অগ্নিকাণ্ড ঘটে। তবে এই ঘটনায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
সংঘাতের জবাবে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট পশ্চিম ইয়েমেনের একাধিক তেল স্থাপনায় বিমান হামলা চালিয়েছে। জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি জানান, হুতিদের সামরিক কার্যক্রমে জ্বালানি জোগাতে এবং লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদাব প্রণালীর আন্তর্জাতিক নৌপথকে হুমকির মুখে ফেলতে যেসকল সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করা হচ্ছিল, সেগুলোকে চিহ্নিত করে এই আক্রমণ চালানো হয়েছে। সানায় বিমান হামলার পর সেখানকার স্থানীয় তেল কোম্পানিগুলোর কার্যালয়ে ধ্বংসযজ্ঞের খবর পাওয়া গেছে। একই সাথে সানা ও আশপাশের এলাকায় তীব্র জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় সাধারণ মানুষ পেট্রোল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইনে ভিড় জমাচ্ছেন।
এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূত্রপাত ঘটেছিল গত শনিবার রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতিদের একটি প্রাণঘাতী হামলার মাধ্যমে, যাতে ১৩ জন নিহত হন এবং বিমানবন্দরটির স্বাভাবিক কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত হয়ে যায়। ২০১৫ সালে ইয়েমেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এটি ছিল সৌদি ভূখণ্ডে অন্যতম ভয়াবহ হামলা। এই ঘটনার পর যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত এক মন্ত্রিসভা বৈঠকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয় যে, সৌদি আরব নিজের নিরাপত্তা কিংবা লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদাব প্রণালীতে মুক্ত নৌ চলাচলের স্বাধীনতায় কোনো ধরনের আঘাত সহ্য করবে না।
চলমান এই পরিস্থিতির মধ্যে বেশ কয়েকটি দেশ সৌদি আরবে বসবাসরত তাদের নাগরিকদের জন্য ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে। ফ্রান্স সরকার তাদের নাগরিকদের রিয়াদ, জেদ্দা ও দাম্মাম বিমানবন্দর এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে। এছাড়া নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রিয়াদের সকল স্কুলে অনলাইন ক্লাস চালু করা হয়েছে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ঘরে বসে কাজ বা 'ওয়ার্ক ফ্রম হোম' নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যার ফলে সচরাচর যানজটে স্থবির থাকা রিয়াদের রাস্তায় যানবাহনের উপস্থিতি অনেকটাই কমে গেছে।
সূত্র: এনডিটিভি