সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলার পর ইয়েমেনের হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রও যোগ দিতে পারে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
তিনি বলেছেন, এ বিষয়ে ওয়াশিংটন বিবেচনা করছে এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
শনিবার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নতুন করে হামলার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
সৌদি আরবের বিমানবন্দরে হামলার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে যুক্ত হবে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, “আমরা যোগ দিতে পারি। বিষয়টি আমরা বিবেচনা করব। আমরা এইমাত্র সর্বশেষ হামলার খবর পেয়েছি। তাই সিদ্ধান্ত নেব। আমরা খুব দ্রুত পদক্ষেপ নিব।”
ট্রাম্পের এ বক্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুতিদের মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র হচ্ছে। বিমানবন্দরে হামলার পর সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটও পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
বিমানবন্দরে হামলায় নিহত ১২, আহত তিন শতাধিক সৌদি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৩০০ জনের বেশি; সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী আহতের সংখ্যা ৩০৯। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে চার সৌদি নাগরিকের পাশাপাশি বাংলাদেশের দু’জন নাগরিকও রয়েছেন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, জর্ডান, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, সুদান ও মিসরের একজন করে নাগরিক নিহত হয়েছেন।
হামলার পর বিমানবন্দরের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। রিয়াদগামী উড়োজাহাজ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয় এবং বিমানবন্দর এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। আহত ব্যক্তিদের অনেককে অ্যাম্বুলেন্স ও হেলিকপ্টারে করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাদের কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে।
এ হামলার পর সৌদি আরবে থাকা নিজ দেশের নাগরিকদের বিমানবন্দর ও আশপাশের এলাকা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেন, এ ঘটনা নিরীহ মানুষের জীবনের প্রতি চরম অবজ্ঞার পরিচয় দেয়।
একই সপ্তাহে একাধিক হামলা রিয়াদের বিমানবন্দরে শনিবারের হামলাটি ছিল ওই সপ্তাহে সেখানে তৃতীয় হামলা। এর আগে হওয়া দুটি হামলায়ও প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটে। সৌদি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, আগের হামলাগুলোতে চারজন নিহত হন এবং বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে থাকা সৌদি আরবের একটি বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সর্বশেষ হামলার পর বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যাত্রী চলাচল ও উড়োজাহাজের সময়সূচিতে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোর কয়েকটি এর আগেই রিয়াদে ফ্লাইট পরিচালনা স্থগিত বা বাতিল করেছিল।
হুতিরা আগের কয়েকটি হামলার দায় স্বীকার করলেও শনিবারের প্রাণঘাতী হামলার দায় তাৎক্ষণিকভাবে স্বীকার করেনি। তবে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট হামলার জন্য হুতিদের দায়ী করেছে এবং কঠোর জবাব দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
ইয়েমেনের সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ইয়েমেনে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনী ও হুতিদের মধ্যে লড়াই নতুন করে তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সৌদি আরবের ওপর হামলাও বেড়েছে। গত কয়েক মাসে মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর সংঘাতের প্রভাব ইয়েমেনের যুদ্ধেও পড়েছে। হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতির ফলে লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মানদেব প্রণালি ঘিরেও উত্তেজনা বেড়েছে।
সৌদি আরব ২০১৫ সালে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিতে হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। দীর্ঘ সংঘাতের পর ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত হলেও চলতি বছরের জুলাইয়ে তা ভেঙে পড়ে। এরপর দুই পক্ষের লড়াই আবার তীব্র হয়ে ওঠে।
সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনী সম্প্রতি হুতিদের দখলে থাকা এলাকাগুলো পুনরুদ্ধারে অভিযান শুরু করেছে। এ অভিযানে সৌদি আরব আকাশপথে সহায়তা দিচ্ছে। অন্যদিকে, হুতিদের হামলা সৌদি আরবের বিমানবন্দর, সামরিক স্থাপনা ও জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণে বাড়তে পারে উত্তেজনা সৌদি অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র যোগ দিলে ইয়েমেনের সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে ট্রাম্পের বক্তব্যে এখনও সামরিক অংশগ্রহণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়নি। তিনি বলেছেন, ওয়াশিংটন পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে।
বিমানবন্দরের মতো বেসামরিক স্থাপনায় হামলার ফলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল এবং মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। পরিস্থিতি কোন দিকে এগোয়, তা নির্ভর করছে সৌদি আরবের সম্ভাব্য পাল্টা পদক্ষেপ এবং হুতিদের পরবর্তী অবস্থানের ওপর। সূত্র: আল-জাজিরা