শিশুরা আমাদের জন্য আল্লাহর দেওয়া আমানত। তাদের সঠিকভাবে বেড়ে ওঠার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। মা-বাবা, শিক্ষক এবং সমাজের সদস্য হিসেবে শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা আমাদের সবার দায়িত্ব। শিশুদের যত্ন, মর্যাদা ও সম্মানের সঙ্গে আচরণ করতে হবে এবং এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে কোনো কিছু তাদের অস্বস্তিতে ফেললে তারা নির্ভয়ে তা বলতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর কথা ও কাজ আমাদের জন্য অনুসরণীয়। শিশুদের কীভাবে ভালোবাসা, যত্ন ও সঠিকভাবে লালন-পালন করতে হবে, তার জীবন এ বিষয়ে আমাদের জন্য চিরন্তন পথনির্দেশনা।
মহানবী (সা.) বলেছেন, মুমিনদের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ ঈমানের অধিকারী সে-ই, যে চরিত্রে উত্তম এবং পরিবারের সদস্যদের প্রতি সবচেয়ে বেশি কোমল ও সদয়। (তিরমিজি)
শিশুদের যত্ন ও লালন-পালনের ক্ষেত্রে মহানবী (সা.)-এর জীবন থেকে পাঁচটি শিক্ষা
১. শিশুদের প্রতি মহানবী (সা.)-এর ভালোবাসা ও মনোযোগ
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) শিশুদের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও দয়া দেখাতেন। শুধু নিজের পরিবারের শিশুদের প্রতিই নয়, তার আশপাশে থাকা অন্য শিশুদের প্রতিও তিনি ছিলেন অত্যন্ত স্নেহশীল।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, আল-আকরাআ ইবনে হাবিস মহানবী (সা.)-কে তার নাতি হাসানকে চুমু দিতে দেখলেন। তখন আল-আকরাআ বললেন, আমার ১০টি সন্তান রয়েছে, কিন্তু আমি তাদের কাউকেই কখনো চুমু দিইনি। জবাবে রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হবে না। (সহিহ মুসলিম)
শিশুদের প্রতি মহানবী (সা.)-এর যত্নের আরেকটি দিক ছিল তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া। আবু উমাইর নামে এক ছোট ছেলে তার পোষা পাখির মৃত্যুতে মন খারাপ করেছিল। মহানবী (সা.) তার মন খারাপের বিষয়টি লক্ষ্য করেন এবং স্নেহের সঙ্গে তার সঙ্গে কথা বলেন।
আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের কাছে আসতেন। আমার ছোট এক ভাই ছিল। তাকে আবু উমাইর নামে ডাকা হতো। তার একটি ছোট পাখি ছিল, যেটি নিয়ে সে খেলত। একদিন পাখিটি মারা গেল। এরপর একদিন মহানবী (সা.) আমাদের কাছে এসে তাকে দুঃখিত অবস্থায় দেখতে পেলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তার কী হয়েছে? লোকেরা বলল, তার পাখিটি মারা গেছে। তখন তিনি বললেন, হে আবু উমাইর, ছোট পাখিটির কী হলো? (সুনানে আবু দাউদ)
এই হাদিসে দেখা যায়, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের কাছে যে বিষয়টি সামান্য মনে হতে পারে, শিশু আবু উমাইরের কাছে সেটি ছিল কষ্টের। মহানবী (সা.) তার সেই কষ্টকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তার এই দৃষ্টান্ত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিশুদের অনুভূতির প্রতি মনোযোগ দেওয়া এবং তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া কতটা জরুরি। এর মাধ্যমে শিশুর সঙ্গে বিশ্বাস ও খোলামেলা যোগাযোগের সম্পর্ক তৈরি হতে পারে এবং তার অনুভূতিরও মূল্যায়ন হয়।
বর্তমানে দৈনন্দিন নানা ব্যস্ততার কারণে মা-বাবার পক্ষে সন্তানদের যথেষ্ট সময় দেওয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। তবে সন্তানদের সঙ্গে খেলাধুলা করা, তাদের কথা মন দিয়ে শোনা এবং অর্থবহ কথোপকথনের জন্য সময় বের করা তাদের স্বস্তি ও নিরাপত্তাবোধ তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি এটি তাদের মানসিক সুস্থতার জন্যও সহায়ক।
২. শিশুদের প্রতি মহানবী (সা.)-এর ধৈর্য
আনাস ইবনে মালিক (রা.) ছোটবেলায় মহানবী (সা.)-এর সেবা করার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন। দীর্ঘ ১০ বছর তিনি তার সেবা করেন। এ সময়ে মহানবী (সা.) কখনো তার প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করে কোনো কথা বলেননি কিংবা তাকে ভর্ৎসনা করেননি। আনাস (রা.) নিজেই বর্ণনা করেছেন, আমি ১০ বছর মহানবী (সা.)-এর সেবা করেছি। তিনি কখনো আমাকে উফ শব্দটিও বলেননি। কখনো বলেননি, তুমি এটা কেন করলে? কিংবা এটা কেন করলে না? (সহিহ বুখারি)
শিশুরা বড় হতে এবং বিভিন্ন বিষয় শিখতে গিয়ে ভুল করবে। তাই মা-বাবার উচিত তাদের প্রতি ধৈর্যশীল থাকা এবং একই সঙ্গে ভালোবাসার সঙ্গে তাদের পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দেওয়া। দ্রুত বকাঝকা করার পরিবর্তে সন্তানের কল্যাণ ও হেদায়াতের জন্য দোয়া করাও উচিত। মহানবী (সা.) শিক্ষা দিয়েছেন, সন্তানের জন্য মা-বাবার দোয়া আল্লাহর কাছে কবুল হওয়া দোয়াগুলোর অন্তর্ভুক্ত।
৩. তরুণদের প্রতি মহানবী (সা.)-এর আস্থা
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) তরুণদের ওপর আস্থা রাখতেন এবং তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিতেন। উসামা ইবনে জায়েদ (রা.)-এর বয়স কম হওয়া সত্ত্বেও মহানবী (সা.) তাকে একটি বাহিনীর নেতৃত্বের দায়িত্ব দিয়েছিলেন।
কিছু মানুষ উসামার নেতৃত্ব নিয়ে সমালোচনা করলে মহানবী (সা.) তার নিয়োগের পক্ষে অবস্থান নেন। তিনি বলেন, তোমরা যদি উসামার নেতৃত্বের সমালোচনা করো, তাহলে এর আগে তোমরা তার বাবা জায়েদের নেতৃত্বেরও সমালোচনা করেছিলে। আল্লাহর কসম, সে নেতৃত্বের যোগ্য ছিল এবং সে ছিল আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় মানুষদের একজন। আর তার পর উসামাও আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় মানুষদের একজন। (সহিহ বুখারি)
ছোটদের সঙ্গে যেমন আচরণ করতেন মহানবী (সা.)
একইভাবে মা-বাবাও সন্তানদের বয়স অনুযায়ী দায়িত্ব দিয়ে এবং পারিবারিক আলোচনা ও সিদ্ধান্তে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ দিয়ে তাদের ওপর আস্থা দেখাতে পারেন। তাদের মতামত শোনা এবং বিভিন্ন কাজে অবদান রাখার সুযোগ দেওয়া হলে শিশুরা নিজেদের মূল্যবান মনে করতে পারে এবং তাদের মধ্যে দায়িত্ববোধও তৈরি হয়।
৪. কন্যা ফাতিমা (রা.)-এর প্রতি মহানবী (সা.)-এর গভীর সম্মান
মহানবী (সা.)-এর ছোট মেয়ে ফাতিমা (রা.) যখন তার কাছে আসতেন, তখন তিনি তাকে স্বাগত জানাতে দাঁড়িয়ে যেতেন। এরপর তার হাত ধরে চুমু দিতেন এবং নিজের বসার জায়গায় তাকে বসাতেন। একইভাবে মহানবী (সা.) যখন ফাতিমা (রা.)-এর কাছে যেতেন, তিনিও উঠে দাঁড়িয়ে তার হাত ধরে চুমু দিতেন এবং নিজের বসার জায়গায় তাকে বসাতেন।
এই সুন্দর আচরণগুলো আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ হলেও বাবা ও মেয়ের মধ্যে থাকা গভীর ভালোবাসা ও পারস্পরিক সম্মানের প্রকাশ।
উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) বলেন, আমি আচরণ, চালচলন ও স্বভাবের দিক থেকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে ফাতিমার চেয়ে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ আর কাউকে দেখিনি। তিনি যখন ফাতিমাকে আসতে দেখতেন, তখন তার জন্য দাঁড়িয়ে যেতেন, তার হাত ধরতেন, তাকে চুমু দিতেন এবং নিজের জায়গায় বসাতেন। আর মহানবী (সা.) যখন ফাতিমার কাছে যেতেন, তখন ফাতিমা উঠে দাঁড়াতেন, তার হাত ধরতেন, তাকে চুমু দিতেন এবং নিজের জায়গায় বসাতেন। (তিরমিজি)
মহানবী (সা.)-এর এই দৃষ্টান্ত আমাদের শেখায়, সন্তানদেরও মর্যাদা ও সম্মানের সঙ্গে আচরণ করা উচিত। মা-বাবার উচিত সন্তানের ব্যক্তিগত বিষয় ও গোপনীয়তার প্রতি সম্মান দেখানো এবং অন্যদের সামনে তাদের বিব্রত বা অপমানিত না করার বিষয়ে সচেতন থাকা।
৫. শিশুদের সঙ্গে সমান আচরণের ওপর মহানবী (সা.)-এর গুরুত্বারোপ
মা-বাবা কখনো জেনে বা না জেনে এক সন্তানের প্রতি অন্য সন্তানের চেয়ে বেশি পক্ষপাত দেখাতে পারেন। মহানবী (সা.) সন্তানদের সঙ্গে ন্যায়সংগত আচরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
নুমান (রা.) থেকে বর্ণিত, তার বাবা তাকে নিয়ে মহানবী (সা.)-এর কাছে এসে তার দেওয়া একটি উপহারের বিষয়ে সাক্ষ্য দিতে বললেন। তখন মহানবী (সা.) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি তোমার সব সন্তানকে এমন উপহার দিয়েছ, যেমনটি তাকে দিয়েছ? তিনি বললেন, না। মহানবী (সা.) বললেন, তাহলে আমি কোনো বিষয়ের ওপর সাক্ষী হব না। তুমি কি চাও না যে, তারা সবাই তোমার প্রতি সম্মান ও সদাচরণে সমান হোক? তিনি বললেন, অবশ্যই চাই। মহানবী (সা.) বললেন, তাহলে আমি সাক্ষী হব না। (সুনানে নাসায়ি)
প্রশংসা, তুলনা কিংবা উপহারের ক্ষেত্রে এক সন্তানের প্রতি অন্য সন্তানের চেয়ে বেশি পক্ষপাত দেখানো থেকে বিরত থাকা উচিত। কারণ এতে শিশুর আত্মমর্যাদা ও নিজের মূল্য সম্পর্কে ধারণার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) তার জীবন ও কর্মের মাধ্যমে দেখিয়েছেন, শিশুদের ভালোবাসা, যত্ন, ধৈর্য ও সম্মানের সঙ্গে কীভাবে লালন-পালন করতে হয়। তার দৃষ্টান্ত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিশুদের যত্ন নেওয়া শুধু তাদের লালন-পালন ও দিকনির্দেশনা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তাদের নিরাপদ, মূল্যবান ও সুরক্ষিত বোধ করানোও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মা-বাবা ও সমাজের সদস্য হিসেবে এসব শিক্ষা নিজেদের দৈনন্দিন জীবনে বাস্তবায়ন করা আমাদের দায়িত্ব। আল্লাহ আমাদের এমন সন্তান লালন-পালনের তাওফিক দিন, যারা তার প্রতি অনুগত হবে, উত্তম চরিত্র নিয়ে বেড়ে উঠবে এবং পরবর্তী সময়ে নিজেদের পরিবার ও সমাজের জন্য কল্যাণের উৎস হয়ে উঠবে।