মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে বিশ্ব বাজারে বেড়ে গেছে জ্বালানি তেলের দাম। এ পরিস্থিতিতে পাকিস্তানেও পেট্রোলের দাম বেড়ে গেছে।
বিশ্ব বাজারে দাম বাড়ায় সেই অতিরিক্ত খরচ ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে পাকিস্তান সরকার।
পাকিস্তানের পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী আলী পারভেজ মালিক সতর্ক করে বলেছেন, জ্বালানি সংকট দেখা দিলে পাকিস্তানে প্রতি লিটার পেট্রোলের দাম এক হাজার পাকিস্তানি রুপিতে পৌঁছাতে পারে।
বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে পাকিস্তানে পেট্রোলের দাম এরই মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে।
বর্তমানে দেশটিতে প্রতি লিটার পেট্রোল ৩৮৯ দশমিক ১৪ পাকিস্তানি রুপিতে বিক্রি হচ্ছে।
কখন পেট্রোলের দাম বাড়ল?
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পরপরই পাকিস্তানে পেট্রোলের দাম বাড়তে শুরু করে।
গত ১ মার্চ প্রতি লিটার পেট্রোলের দাম ছিল ২৬৬ দশমিক ১৭ পাকিস্তানি রুপি।
৭ মার্চ তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩২১ দশমিক ১৭ রুপিতে। ৩ এপ্রিল সরকার ৪ শতাংশের বেশি দাম বাড়ানোর পর প্রতি লিটার পেট্রোলের দাম বেড়ে ৪৫৮ দশমিক ৪১ রুপিতে পৌঁছায়।
এরপর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম কমলে পাকিস্তানেও পেট্রোলের দাম কমতে শুরু করে। ২০ জুন প্রতি লিটার পেট্রোলের দাম নেমে আসে ২৯৯ দশমিক ৫০ রুপিতে।
তবে পরে আবার দাম বাড়তে থাকে। ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতি লিটার পেট্রোলের দাম দাঁড়িয়েছে ৩৮৯ দশমিক ১৪ পাকিস্তানি রুপি। পাকিস্তানের অয়েল অ্যান্ড গ্যাস রেগুলেটরি অথরিটি (ওজিআরএ) জানিয়েছে, সর্বশেষ দাম নির্ধারণে আন্তর্জাতিক বাজারের জ্বালানির দাম, প্রিমিয়াম এবং অন্যান্য মূল্য নির্ধারণের বিষয় বিবেচনা করা হয়েছে।
পেট্রোলের দাম বাড়ার কারণ
পাকিস্তানে পেট্রোলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার ওপর বেশি নির্ভরশীল। এর অন্যতম কারণ হলো, দেশটি বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি করে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে (জুলাই ২০২৫ থেকে জুন ২০২৬) পাকিস্তান ৫৩ লাখ ৫০ হাজার টন মোটর স্পিরিট বা পেট্রোল আমদানি করেছে। একই সময়ে দেশটির স্থানীয় তেল শোধনাগারগুলো প্রায় ২৬ লাখ ৩০ হাজার টন পেট্রোল সরবরাহ করেছে।
অন্যদিকে তেল বিপণন কোম্পানিগুলো (ওএমসি) প্রায় ৭৬ লাখ ৮০ হাজার টন পেট্রোল বিক্রি করেছে।
আমদানি করা পেট্রোলের পরিমাণ ওএমসিগুলোর মোট পেট্রোল বিক্রির প্রায় ৬৯ দশমিক ৭ শতাংশের সমান। তবে এসব তথ্য সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায় থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। তাই এগুলোকে দেশের মোট পেট্রোল সরবরাহের ১০০ শতাংশের সরাসরি বিভাজন হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
আমদানি খরচ থেকে পাম্পের দাম
পেট্রোলের পাম্পের দামের মধ্যে শুধু আমদানি করা জ্বালানির খরচই থাকে না, এর সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের শুল্ক, পরিবহন ব্যয়, কমিশন ও সরকারি করও যোগ হয়। ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর দামের হিসাবে, শুল্কসহ পেট্রোলের আমদানি ও শোধনাগার পর্যায়ের দাম ছিল প্রতি লিটার ২৭৮ দশমিক ৫৮ পাকিস্তানি রুপি।
এর সঙ্গে যোগ হয় অভ্যন্তরীণ পরিবহন সমন্বয় মার্জিন হিসেবে ৭ দশমিক ৭১ রুপি, তেল বিপণন কম্পানির (ওএমসি) মার্জিন ৭ দশমিক ৮৭ রুপি এবং ডিলার কমিশন ৯ দশমিক ৯৮ রুপি।
এ ছাড়া পেট্রোলিয়াম লেভি হিসেবে ৮০ রুপি এবং ক্লাইমেট সাপোর্ট লেভি হিসেবে আরও ৫ রুপি যোগ করা হয়। সব মিলিয়ে প্রতি লিটার পেট্রোলের চূড়ান্ত পাম্প মূল্য দাঁড়ায় ৩৮৯ দশমিক ১৪ পাকিস্তানি রুপি।
পাকিস্তানের অয়েল অ্যান্ড গ্যাস রেগুলেটরি অথরিটি (ওজিআরএ) পেট্রোলের দাম নির্ধারণের বিস্তারিত হিসাব প্রকাশ করে।
পাকিস্তানি রুপির মানও মার্কিন ডলারের বিপরীতে দুর্বল হয়েছে। ফলে আমদানি করা জ্বালানির খরচ দেশটির মুদ্রায় আরও বেড়েছে।
২২ সেপ্টেম্বরের হিসাবে, ১ মার্কিন ডলারের মূল্য ছিল প্রায় ২৭৭ দশমিক ২১ পাকিস্তানি রুপি। একই সময়ে ভারতে ১ ডলারের মূল্য ছিল ৯৫ দশমিক ৮২ ভারতীয় রুপি, বাংলাদেশে ১২২ দশমিক ৭২ টাকা এবং নেপালে ১৫৩ দশমিক ৬১ নেপালি রুপি।
পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এর অর্থ হলো, ডলারে মূল্য নির্ধারিত পেট্রোল আমদানি করতে বেশি রুপি খরচ হচ্ছে। এতে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির দামের ওপর আরও চাপ তৈরি হচ্ছে।
পাকিস্তানে ভোক্তাদের পাম্পে কত দামে পেট্রোল কিনতে হবে, তা নির্ধারণে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর মধ্যে রয়েছে আমদানি করা পরিশোধিত পেট্রোলের দাম, আন্তর্জাতিক বাজারের জ্বালানির মূল্য, পরিবহন খরচ ও প্রিমিয়াম, বিভিন্ন সরকারি লেভি এবং ডলারের বিপরীতে পাকিস্তানি রুপির বিনিময় হার।