মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে মিডিয়া অ্যান্ড সিভিল রাইটস সোসাইটির উদ্যোগে আয়োজিত ‘চট্টগ্রাম বন্দর ও জাতীয় স্বার্থ’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আনু মুহাম্মদ বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের অর্থনীতির হৃদপিণ্ড। দেশের আমদানি-রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ এ বন্দর দিয়ে হয়। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার সঙ্গে অন্যান্য দেশের বন্দর ব্যবস্থাপনার তুলনা চলে না।
তিনি বলেন, ‘কোনো দেশের ধরেন ১০-২০টি কিংবা ১০০টি বন্দর আছে, সেখানে তারা যদি ৫-৬টি বন্দর বিদেশি কোম্পানিকে দেয় সেটির একটি অর্থ আছে। কিন্তু যেখানে মূল বন্দরই একটি, যেখানে এই একটি বন্দরের ওপর দেশের পুরো অর্থনীতি নির্ভর করে, সেটি তো অন্যজনের হাতে তুলে দেওয়া যায় না।
চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালনায় বাংলাদেশের সক্ষমতা রয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, এরই মধ্যে নৌবাহিনী ও দেশীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন ক্ষেত্রে সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে।
তিনি বলেন, এরই মধ্যে যারা পরিচালনা করছেন এবং নৌবাহিনী কিংবা প্রাইভেট কোম্পানি, তারা দেখিয়েছেন- এটি যদি রাষ্ট্রীয়ভাবে যথাযথ ও পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা করা যেতো তবে জাতীয় সক্ষমতার একটা ভিত্তি দাঁড় করানো সম্ভব ছিল। অথচ কোনো সরকার সে পথেই যায়নি।
ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রসঙ্গ টেনে আনু মুহাম্মদ বলেন, ডিপি ওয়ার্ল্ড তো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। এই রাষ্ট্রগুলো তাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ে, জাতীয় সক্ষমতা নিয়ে তারা এরকম একটা পজিশন নিতে পারে যে তারা আন্তর্জাতিকভাবে বিনিয়োগ করতে পারে। বাংলাদেশ যদি সিঙ্গাপুর হতে চায় তাহলে উল্টো দিক দিয়ে গিয়ে কী করে সিঙ্গাপুর হবে?
তিনি বলেন, জাতীয় সক্ষমতার ওপর দাঁড়িয়েই সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশ নিজেদের অবস্থান শক্ত করে। বাংলাদেশেরও একইভাবে জাতীয় সক্ষমতার ভিত্তি তৈরি করা প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্রের বন্দর ব্যবস্থাপনার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক ও টেন্ডার প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে অনেক সময় রাষ্ট্রীয় স্বার্থ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
চট্টগ্রাম বন্দরের নিয়ন্ত্রণ বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে গেলে অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ‘এটার মাসুল বাড়বে, ক্ষতি বাড়বে, রাজস্ব আয় কমবে এবং আমাদের কর্তৃত্ব হাতছাড়া হবে’- বলেন তিনি।
তিনি বলেন, কিছু তো পরিবর্তনের সূচনা হয়। কোনো ধরনের পরিবর্তনের সূচনাই আমরা দেখতে পাচ্ছি না। পরিবর্তনের সূচনা করতে গেলে তো ন্যূনতম জাতীয় সক্ষমতার ওপরে, জাতীয় স্বার্থের ওপরে দাঁড়ানোর একটা জায়গায় দাঁড়াতে হয়।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা বাড়াতে কাস্টম, আমলাতন্ত্র ও অবকাঠামোতে পরিবর্তন প্রয়োজন। এসব পরিবর্তনের সঙ্গে বিদেশি কোম্পানি আনার সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই।
‘কাস্টমসের পরিবর্তন দরকার, আমলাতন্ত্রের পরিবর্তন দরকার, অবকাঠামোর পরিবর্তন দরকার। বিদেশি কোম্পানি আসার সঙ্গে সেটার কোনো সম্পর্ক নাই। বিদেশি কোম্পানি আনার অর্থ শুধু অর্থনৈতিক না, এর যে রাজনৈতিক-সামরিক মাত্রা আছে, সেটাও আমাদের খুব গুরুত্বসহ বিবেচনা করতে হবে’- যোগ করেন তিনি।
শ্রমিকদের আন্দোলনের কথা উল্লেখ করে আনু মুহাম্মদ বলেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শ্রমিকরা আন্দোলন করেছিলেন এবং তাদের দৃঢ়তার কারণেই বন্দর রক্ষা পেয়েছে।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের যে আন্দোলন, যে প্রতিরোধের কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আমরা এই সর্বনাশ থেকে রক্ষা পেয়েছিলাম, সেই প্রতিরোধটাই অব্যাহত রাখতে হবে।
দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প নিয়ে সরকারের জবাবদিহির অভাব রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এ প্রসঙ্গে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের উদাহরণ দেন।
অনুষ্ঠানে সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ কাফি রতন, মাওলানা ভাসানী পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ড. হারুন অর রশীদ, চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটির নেতা ও জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাধারণ সম্পাদক কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার, গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সত্যজিৎ বিশ্বাস, ছাত্র কাউন্সিলের সভাপতি সায়েদুল হক নিশান, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর প্রেসিডেন্ট দিলীপ রায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোশাহিদা রিতু, নাগরিক ঐক্যের সাংগঠনিক সম্পাদক সাকিব আনোয়ারসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন দৈনিক আমার দেশ-এর চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান সোহাগ কুমার বিশ্বাস। মিডিয়া অ্যান্ড সিভিল রাইটস সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক বাতেন বিপ্লবের সঞ্চালনায় গোলটেবিল বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।