বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সাউরির রহস্যজনক মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনী কর্মকর্তা কল্যাণ সমিতি (রাওয়া)। ঘটনাটির পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য সামনে আনা এবং কেউ জড়িত থাকলে— তাকে আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করার আহ্বান জানিয়েছেন সংগঠনটির নেতারা। একইসঙ্গে তারা বলেছেন, আমরা দেখবো, মনিটর করবো, কীভাবে এর বিচার হয় এবং এর ফ্যাক্ট উদঘাটন হয়। আমরা ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত চাই এবং যারা ধরা পড়বে তাদের বিচার চাই।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাজধানীর উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে রাজউক অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের ‘করবী’ ভবনে তাহসিফের বাসায় গিয়ে তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন রাওয়ার নেতারা। এ সময় তারা পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান এবং প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে দুপুরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন রাওয়ার যুগ্ম সম্পাদক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু নওরোজ খুরশিদ আলম।
তিনি বলেন, তাহসিফের মৃত্যু অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক ঘটনা। পরিবারের এই কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের কী ধরনের সহযোগিতা প্রয়োজন, তা জানতেই রাওয়ার প্রতিনিধিরা এসেছেন।
তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিমের সঙ্গে কথা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এই অবস্থার মধ্যে পরিবারের অনেক কিছু করার থাকলেও হয়তো করতে পারে না। আমরা তার কাছে জানতে চেয়েছি, কী কী করার আছে এবং আমরা কী ধরনের সাহায্য করতে পারি।’
পরিবারের কাছ থেকে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে কিছু তথ্য পাওয়ার কথা উল্লেখ করে রাওয়ার এই নেতা বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা ঘটনাটির অনুসন্ধান করছে। তদন্তকারীরা প্রত্যক্ষদর্শীদের খোঁজ করছেন এবং ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও পর্যালোচনার চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে তাহসিফের বাবা তাদের জানিয়েছেন।’
তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত প্রকৃত ঘটনা উদঘাটিত হবে বলে আশা প্রকাশ করে আবু নওরোজ খুরশিদ আলম বলেন, ‘আমরা আশা করি, খুব তাড়াতাড়ি তারা আসল সত্য উদঘাটন করবেন এবং তদানুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।’
তিনি আরও বলেন, দেশবাসীর মতো ডিফেন্স কমিউনিটির সব সদস্য আশা করছেন, অতি দ্রুত সত্য উদঘাটন করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এ সময় তাহসিফের পরিবারের পাশে থেকে সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
রাওয়ার আরেক সদস্য অবসরপ্রাপ্ত মেজর আল আমিন বলেন, ‘এ ঘটনাকে আমরা ছেড়ে দেবো না। আমরা দেখবো, মনিটর করবো, কীভাবে এর বিচার হয় এবং এর ফ্যাক্ট উদঘাটন হয়। আমরা ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত চাই এবং যারা ধরা পড়বে তাদের বিচার চাই।’’
গত বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকালে তুরাগ নদীর রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তাহসিফ সাউরির ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় শুরু থেকেই বেশ কিছু প্রশ্ন সামনে এসেছে। বিশেষ করে মৃত্যুর আগে তার সর্বশেষ গতিবিধি, বন্ধুস্থানীয় ছোট ভাই আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের সঙ্গে অবস্থান এবং মধ্যরাতে টঙ্গীর একটি এলাকায় যাওয়ার বিষয়টি তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।
পুলিশ ও পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় দীপের ডাকে বাসার নিচে নামেন তাহসিফ। পরে নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে বাসা থেকে বের হন তিনি। এরপর আর বাসায় ফেরেননি।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সাংবাদিকদের দীপ জানিয়েছিলেন, তাহসিফের সঙ্গে একটি রেস্তোরাঁয় রাতের খাবার খাওয়ার পর উত্তরার হাউজবিল্ডিং এলাকায় তারা আলাদা হয়ে যান। তবে পরবর্তী সময়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) জিজ্ঞাসাবাদে মধ্যরাতে তাহসিফের সঙ্গে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যাওয়ার কথা স্বীকার করেন দীপ।
বৃহস্পতিবার রাতেই রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বাসা থেকে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় পিবিআই। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সকালে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে তাহসিফের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়। মাদক কেনাবেচার স্থান হিসেবে পরিচিত ওই এলাকায় মধ্যরাতে তাহসিফের সঙ্গে যাওয়ার তথ্য পাওয়ার পর দীপকে নিয়ে শুক্রবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন পিবিআই কর্মকর্তারা।
হত্যা মামলা, ৪ দিনের রিমান্ডে দীপ
এদিকে মরদেহ উদ্ধারের তিন দিন পরও মামলা না হওয়ায় দীপের বিষয়ে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা চলছিল। এর মধ্যেই শুক্রবার রাতে তাকে নৌ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে পিবিআই। একই রাতে তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম উত্তরখান থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে একটি হত্যা মামলা করা হয়।
মামলায় নির্দিষ্ট করে কাউকে অভিযুক্ত করা না হলেও ঘটনার দিন মধ্যরাত পর্যন্ত তাহসিফের সঙ্গে থাকা দীপকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। নৌ পুলিশ জানিয়েছে, মামলায় দীপের সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন করার পর আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।